বিশ্বজুড়ে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত, যার মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাষাতাত্ত্বিক তথ্যভাণ্ডারের সর্বশেষ ডাটায় দেখা যায়, পৃথিবীতে ব্যবহৃত ৭ হাজার ১৫৯টি ভাষার মধ্যে ৩ হাজার ১৯৩টি ভাষা ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশ্বায়ন, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং প্রজন্মগত ভাষা স্থানান্তরের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের বহু ভাষা টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা ইংরেজি। বিশ্বের ১৮৬টি দেশে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। তবে এদের মাত্র ২০ শতাংশের মাতৃভাষা ইংরেজি; বাকিরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। ব্যবহারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে মান্দারিন চীনা, যার বক্তা প্রায় ১২০ কোটি। তৃতীয় স্থানে রয়েছে হিন্দি; এরপর স্প্যানিশ ও আরবি।
পৃথিবীতে চিহ্নিত লিখনপদ্ধতির সংখ্যা ২৯৩টি। এর মধ্যে ১৫৬টির বেশি লিখনপদ্ধতি এখনও ব্যবহৃত হয়, আর বাকি অংশ ইতিহাসে বিলুপ্ত। লাতিন লিপি বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৩০৫টি ভাষায় ব্যবহৃত হয় এবং বিশ্বের ৭০ শতাংশ মানুষ এই লিপিতে লেখা ভাষা ব্যবহার করেন।
বিশ্বজুড়ে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ৪৪ শতাংশ ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে, ৪৯ শতাংশ ভাষা স্থিতিশীল, আর মাত্র ৭ শতাংশ ভাষা সরকার, শিক্ষা বা গণমাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়। ভাষাবিদদের মতে, কোনো সমাজে মানুষ যখন মাতৃভাষার পরিবর্তে বড় ভাষা সন্তানদের শেখায়, তখনই ভাষা বিপন্ন হয়ে ওঠে। বর্তমানে ৮ কোটি ৮১ লাখ মানুষ বিপন্ন ভাষার বক্তা, যার মধ্যে বহু ভাষায় বক্তার সংখ্যা এক হাজারেরও কম।
বিপন্ন ভাষার ৮০ শতাংশ মাত্র ২৫টি দেশে পাওয়া যায়। অঞ্চলভিত্তিকভাবে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ভাষা রয়েছে ওশেনিয়ায়। এরপর এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং ইউরোপের অবস্থান।
নিচে অঞ্চলভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিপন্ন ভাষার উদাহরণ দেওয়া হলো:
ওশেনিয়া
অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলে কথিত ইউগামবেহ একটি বিপন্ন আদিবাসী ভাষা। গোল্ড কোস্ট, সিনিক রিম ও লোগান অঞ্চলে ইউগামবেহ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষাটি ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমিউনিটির উদ্যোগে ভাষাটি পুনরুজ্জীবনের কাজ শুরু হয়েছে এবং তরুণদের শেখার জন্য বিশেষ অ্যাপ চালু করা হয়েছে।
এশিয়া
জাপানের আদিবাসী ভাষা আইনু বা আইনু ইতাক গুরুতর বিপন্ন। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, এটি কোনো নির্দিষ্ট ভাষা পরিবারের সঙ্গে যুক্ত নয়। ২০০৬ সালের জরিপে দেখা যায়, ২৩ হাজারের বেশি আইনু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৩০৪ জন ভাষাটি জানতেন। বর্তমানে বক্তার সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে বলে ধারণা।
আফ্রিকা
ইথিওপিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে অঙ্গোটা ভাষা অত্যন্ত বিপন্ন। ওয়েইতো নদীর পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা এটি। বর্তমানে ওই গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪০০ হলেও ভাষাটি বলতে পারেন মাত্র কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি।
আমেরিকা
উত্তর ও মধ্য আমেরিকার অধিকাংশ আদিবাসী ভাষাই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। যুক্তরাষ্ট্রে লুইজিয়ানা ক্রেওল একটি গুরুতর বিপন্ন ভাষা, যার মূল গঠন ফরাসিভিত্তিক হলেও এর মধ্যে আফ্রিকান ও আদিবাসী ভাষার প্রভাব রয়েছে। বর্তমানে মূলত প্রবীণরাই এটি ব্যবহার করেন।
বলিভিয়ার লেকো ভাষাও বিপন্ন অবস্থায়। বিচ্ছিন্ন ভাষা হিসেবে পরিচিত লেকোর কোনো ভাষাতাত্ত্বিক আত্মীয় নেই। লেকো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ হলেও ভাষাটি বলতে পারেন মাত্র কয়েকজন প্রবীণ বক্তা।
ইউরোপ
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে কথিত কর্নিশ বা কেরনেউইক ভাষাকে একসময় ইউনেস্কো বিলুপ্ত ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পরে পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টার ফলে ২০১০ সালে বিপন্ন ভাষার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২১ সালের আদমশুমারিতে ৫৬৩ জন মানুষ কর্নিশ ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সিএ/এসএ


