ইরাকের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নুরি আল-মালিকির নাম প্রস্তাব করতেই দেশটির রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শিয়া রাজনৈতিক জোট কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক (সিএফ) মালিকিকে মনোনীত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর সতর্কবার্তা— যদি মালিকি ক্ষমতায় ফেরেন, তবে ওয়াশিংটন ইরাকের প্রতি সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দেবে। এর পরপরই সিএফ জোটের ভেতরে কৌশলগত মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে শিয়া জোট সিএফ সর্বোচ্চ আসন পায়। এরপর জানুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেন, আল-মালিকি ক্ষমতায় ফিরলে ইরাকের সফলতা, সমৃদ্ধি বা স্বাধীনতার কোনো সুযোগই থাকবে না। মার্কিন প্রশাসন বহুদিন ধরেই মালিকিকে ইরাকের ওপর ইরানের প্রভাব বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখে। তাদের মতে, তাঁর প্রত্যাবর্তন ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের যেসব উদ্যোগ ইরাকে ইরানের প্রভাব কমাতে চালানো হয়েছে, তা ব্যাহত হবে।
তবে এসব চাপ সত্ত্বেও সিএফ-এর বড় অংশ মালিকির প্রার্থিতা এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা মনে করে, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন ইরাকের সাংবিধানিক বিষয় এবং কোনো বিদেশি পক্ষ এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সাবেক উপ-সংসদ স্পিকার মোহসেন আল-ম্যান্ডালাওয়ি, বদর সংগঠনের নেতা হাদি আল-আমিরি এবং ইসলামিক সুপ্রিম কাউন্সিলের হুমাম হামুদি মালিকির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানিও আনুষ্ঠানিকভাবে মালিকিকে সমর্থন দিয়েছেন, যদিও তিনি নিজেও দ্বিতীয় মেয়াদের সম্ভাবনা পুরোপুরি ছাড়েননি।
অন্যদিকে সিএফ-এর মধ্যেই মালিকির বিরোধিতা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। আসায়িব আহল আল-হাক-এর নেতা কায়েস আল-খাজালি, ন্যাশনাল স্টেট ফোর্সেস অ্যালায়েন্সের আম্মার আল-হাকিম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি প্রকাশ্যে মালিকির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, তাঁর নির্বাচনে ইরাক ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণামের মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সিএফ-এর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়।
মালিকির সামনে চ্যালেঞ্জ কেবল শিয়া রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইরাকের সুন্নি রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ তাঁর বিরুদ্ধে, পাশাপাশি কুর্দি রাজনীতিতেও অচলাবস্থা চলছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কেডিপি ও পিইউকে এখনো কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে না পারায় সরকার গঠন প্রক্রিয়া আটকে আছে। ইরাকি সংবিধান অনুযায়ী প্রথমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হবে, তারপর তিনি সংসদের বৃহত্তম জোটের প্রার্থীকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করবেন।
কুর্দি সংকট সমাধানে সিএফ-এর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আল-সুদানি এবং আল-মালিকি দুই দলকেই আলোচনায় বসাতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনো পক্ষই সমঝোতায় আসেনি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আটকে থাকায় প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নও ঝুলে আছে।
এর পাশাপাশি তাকাদুম পার্টির নেতা মোহাম্মদ আল-হালবৌসিও মালিকির বিরোধিতায় সোচ্চার। প্রয়োজনে মালিকিবিরোধী গোষ্ঠীগুলো সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন ধরে রেখে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কোরাম নস্যাৎ করতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ইরাকে সরকার গঠন দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সিএফ যদি বিকল্প প্রার্থী বেছে নিতে না পারে, তাহলে শেষ পর্যন্ত আল-সুদানি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারেন।
সিএ/এসএ


