অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর সদর দপ্তর ভেঙে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৭টার দিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বে বাহিনীটি ওই কম্পাউন্ডে অভিযান চালায়। অভিযান শেষে মূল ভবনের ওপর ইসরায়েলের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযান চলাকালে ইতামার বেন-গভির বলেন, ‘এটি জেরুজালেমে (ইসরায়েলি) সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ এই সন্ত্রাসের সমর্থকদের, তারা যা কিছু তৈরি করেছে তার সবকিছুর সঙ্গে একসঙ্গে এখান থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি সন্ত্রাসের সমর্থকের সঙ্গে এভাবেই আচরণ করা হবে।’
এই অভিযানে বেন-গভিরের সঙ্গে ছিলেন জেরুজালেমের কট্টর ডানপন্থী ডেপুটি মেয়র আরিয়েহ কিং। ধ্বংসযজ্ঞের সময় আরিয়েহ কিং প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমরা ইউএনআরডব্লিউএর সব কর্মীকে তাড়িয়ে দেব, হত্যা করব, নিশ্চিহ্ন করব এবং ধ্বংস করে দেব।’
ইউএনআরডব্লিউএর কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ‘খোলাখুলি ও ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞার এক নতুন স্তর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, ‘এটি একটি জাতিসংঘ সংস্থা ও এর স্থাপনার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন হামলা।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘আজ ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে যা ঘটছে, আগামীকাল সেটাই ঘটবে অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে, হোক তা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বা বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানে।’
সংস্থাটির আরবি ভাষার মুখপাত্র আদনান আবু হাসনা জানান, এভাবে কোনো দেশ আগে কখনো জাতিসংঘের পতাকা তাদের কার্যালয় থেকে নামিয়ে দেয়নি। তিনি আল-আরাবি টিভিকে বলেন, ‘ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের ফলে এখন ইউএনআরডব্লিউএর আর কোনো সদর দপ্তর, অফিস বা প্রতিষ্ঠান মাটিতে অবশিষ্ট নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল ইউএনআরডব্লিউএ ভেঙে ফেলা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যাকে নির্মূল করার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে।’
অন্যদিকে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযানের পক্ষে সাফাই গেয়ে ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে হামাসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ‘ইউএনআরডব্লিউএ-হামাস ইতিমধ্যে এই স্থানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করেছিল এবং সেখানে আর কোনো জাতিসংঘ কর্মী বা কার্যক্রম ছিল না।’ তাদের আরও দাবি, ওই কম্পাউন্ড কোনো ধরনের কূটনৈতিক সুরক্ষা বা দায়মুক্তির আওতায় পড়ে না এবং এর দখল নেওয়া ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফিলিস্তিনি জেরুজালেম গভর্নরেট এই ঘটনাকে ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক দায়মুক্তিতে সুরক্ষিত একটি জাতিসংঘ সংস্থার ওপর সরাসরি হামলা।
এর আগে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আইনের ফলে ১৯৬৭ সালের একটি চুক্তি বাতিল হয়ে যায়, যা ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইউএনআরডব্লিউএকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইউএনআরডব্লিউএর ওপর নির্ভরশীল লাখো ফিলিস্তিনি শরণার্থীর জন্য ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, এটি ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের শরণার্থী মর্যাদা বাতিলের দিকেও একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
ইউএনআরডব্লিউএ বর্তমানে গাজা, পশ্চিম তীর, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননে প্রায় ৫৯ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে সহায়তা দিয়ে আসছে। অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় এটি প্রধান জাতিসংঘ সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। গাজায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বড় একটি অংশ খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার জন্য এই সংস্থার ওপর নির্ভরশীল, পাশাপাশি বহু ছোট ত্রাণ সংস্থাও তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ইউএনআরডব্লিউএর বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।
সিএ/এসএ


