তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইস্যুতে তার লক্ষ্য ‘জয়’ অর্জন। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিক ভিত্তিতে টিকে থাকা ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এমন জয়ের কোনো সহজ পথ নেই। বরং যেকোনো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরান ঘোষণা দিয়েছে, তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার অর্থপূর্ণ জবাব দেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও তা শাসনব্যবস্থার পতন নিশ্চিত করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে তা ওয়াশিংটন ও পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়কর ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। স্টিমসন সেন্টার থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘সব বিকল্পই বেশ ভয়ঙ্কর।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক’ বা ‘খ’ করলে কী হবে তা জানা খুবই কঠিন। অথবা এর পরিণতি কী হবে? এবং বিশেষ করে যদি ইরানের শাসকগোষ্ঠী মনে করে যে, তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাহলে তারা এই অঞ্চলে আমেরিকান বাহিনীর বিরুদ্ধে, সত্যিই ভয়াবহভাবে আক্রমণ করতে পারে।’
গত ডিসেম্বরে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যদি ইরান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে এবং সহিংসভাবে হত্যা করে, যা তাদের রীতি, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।’
পরবর্তী দুই সপ্তাহে ট্রাম্প একাধিকবার এই হুমকির পুনরাবৃত্তি করেন এবং বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানান। তিনি তাদের আশ্বাস দেন, সহায়তা আসছে। তবে এসব হুঁশিয়ারির পরও ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এতে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, বিক্ষোভ দমনে সরকারের নৃশংসতার কারণে ট্রাম্প নিজেকে ‘মানবিক হস্তক্ষেপকারী’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি এবার ভিন্ন হতে পারে। ইরানি কর্তৃপক্ষ হয়তো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় সংঘর্ষ এড়াতে তারা আর নতুন হামলা সহ্য করবে না, যদিও তারা জানে এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
পারসি আরও বলেন, ‘ট্রাম্পকে পুরো ইরানের শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করতে হতে পারে। ইরানিরা সেই যুদ্ধে ট্রাম্পের সাথে জিততে পারবে না, কিন্তু তাদের তা করার দরকার নেই। তাদের কেবল নিশ্চিত করতে হবে, তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে হেরে যাওয়ার আগে ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব ধ্বংস করে দেবে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক নায়সান রাফাতির মতে, অতীতে কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত হামলা ইরান সহ্য করেছিল, কারণ সেগুলোর মাত্রা সীমিত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে শাসকগোষ্ঠী অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামান্য হামলাও তেহরানের কাছ থেকে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ‘জয়’ কৌশল বাস্তবে প্রয়োগ করা সহজ হবে না, বরং এতে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সিএ/এসএ


