১৯ বছর ধরে একের পর এক কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অবশেষে পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের এক গৃহবধূ। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) ফতেহাবাদ জেলার ভুনা ব্লকের ঢানি ভোজরাজ গ্রামে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। পুত্র সন্তান পাওয়ার আশায় ওই নারী মোট ১১ বার গর্ভধারণ করেন।
গ্রাম সূত্রে জানা যায়, ঢানি ভোজরাজ গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় ও সুনীতার বিয়ে হয় প্রায় ১৯ বছর আগে। দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই তাদের ইচ্ছা ছিল একটি পুত্র সন্তান। কিন্তু প্রতিবারই সুনীতা কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। টানা ১০টি কন্যা সন্তানের পরও পুত্র সন্তানের প্রত্যাশা থেকে সরে আসেননি তারা।
সঞ্জয় জানান, তিনি কখনোই তার মেয়েদের বোঝা হিসেবে দেখেননি। বরং সব মেয়েকেই ছেলের মতো করেই গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তার বড় মেয়ের বয়স এখন ১৮ বছর, সে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। অন্য মেয়েরাও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আর্থিক সংকট সত্ত্বেও সঞ্জয় ও সুনীতা মেয়েদের শিক্ষা ও লালন-পালনে কোনো ধরনের অবহেলা করেননি। সীমিত আয়ের মধ্যেই সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছেন তারা।
গ্রামবাসীরা বলছেন, সঞ্জয়ের পরিবার সবসময়ই সাধারণ জীবনযাপন করে এসেছে। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, আত্মসম্মান ও মানবিক মূল্যবোধে বড় করে তোলার চেষ্টা করেছে পরিবারটি। এ কারণেই এলাকাবাসীর কাছে এই পরিবারটি একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
পুত্র সন্তানের জন্মের সময় উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সঞ্জয় তার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। জন্মের পর নবজাতকটি রক্তাল্পতায় ভুগছিল। চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করেন। সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ায় শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হয়। বর্তমানে মা ও ছেলে দুজনেই সুস্থ আছেন। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর পরিবারটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে।
পুত্র সন্তানের আগমনে পরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হচ্ছে। সঞ্জয়ের মা মায়া দেবী নাতির জন্মে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ঈশ্বর তার বহুদিনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তার একটাই আকাঙ্ক্ষা ছিল, পরিবারে একটি নাতি থাকুক। সঞ্জয়ের বাবা কাপুর সিং আগেই মারা গেছেন।
সঞ্জয় জানান, একসময় তিনি গণপূর্ত বিভাগে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৮ সালে চাকরি হারানোর পর মনরেগার অধীনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পরিবার চালিয়েছেন। তবে গত এক বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় তিনি বর্তমানে বেকার। তবুও তার মুখে হতাশার ছাপ খুব কমই দেখা যায়।
তিনি বলেন, জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও কখনো পরিশ্রম থেকে পিছপা হননি। সন্তানদের জন্য যা করা সম্ভব, সবই করার চেষ্টা করেছেন। পরিস্থিতি যেমনই হোক, সন্তানদের শিক্ষা ও প্রয়োজন মেটানোই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
সঞ্জয় আরও জানান, তার এক কন্যা সন্তানকে এক আত্মীয় দত্তক নিয়েছেন। বাকি নয়জন মেয়েকে স্বামী-স্ত্রী মিলে নিজেরাই লালন-পালন করছেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘কন্যারা কারো চেয়ে কম নয়। যদি তারা শিক্ষিত হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তারাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।’
সিএ/এএ


