নরওয়ের উত্তরাঞ্চলের ছোট শহর বোডো, যার জনসংখ্যা মাত্র ৫৫ হাজার, মাছ ধরা ও শীতকালীন প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। গ্রীষ্মকালে সূর্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ অস্ত যায় না, আর শীতকালে সূর্য দেখা মেলে না। এমনকি এক রাতের উইন্টার স্টর্ম শহরটিকে বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ঘূর্ণিবাতাস এবং তুষারপাত এখানে প্রতিদিনের সঙ্গী। মে মাসের মাঝামাঝিও হঠাৎ তুষারপাত শুরু হতে পারে, ঠিক তখন যখন বসন্তের আগমন আশা করা হয়।
এই বৈচিত্র্যময় শহর থেকে উঠে এসেছে বোডো/গ্লিমট ক্লাব, যা সাম্প্রতিক চ্যাম্পিয়নস লিগে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলিকে হতবাক করে দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ম্যানচেস্টার সিটি, আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং শেষ পর্যন্ত ইন্টার মিলানকে উড়িয়ে দিয়ে বোডো/গ্লিমট শেষ ষোলোতে উঠেছে। টানা দুই লেগে ৫-২ গোলে ইন্টার মিলানকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে নরওয়েজীয় এই দল।
কয়েক বছর আগেও বোডো/গ্লিমটের স্টেডিয়াম অর্ধেক খালি থাকত। তবে সাম্প্রতিক সাফল্যের পর শহরের প্রতিটি কোণে, এমনকি স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের বাইরে উড়তে দেখা যায় উজ্জ্বল হলুদ পতাকা। শহরের প্রতিটি বয়সী মানুষ ম্যাচের দিন উৎসব করে; স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনও উল্লসিত হয়ে বোডো/গ্লিমটের গান গায়।
২০১০ সালে ক্লাবটি প্রায় দেউলিয়া হওয়ার মুখে ছিল। খেলোয়াড়রা মাসের পর মাস বেতন ছাড়া খেলতেন। স্থানীয়রা খালি বোতল ও মাছ বিক্রি করে ক্লাবকে অর্থ সংগ্রহ করতেন। সাবেক খেলোয়াড় ও বর্তমান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার প্যাট্রিক বার্গের মামা রানার বার্গ তহবিল সংগ্রহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বার্গ পরিবার আট দশক ধরে ক্লাবের সাথে জড়িত। হারাল্ড বার্গ ১৯৫৮ সালে বোডো/গ্লিমটে অভিষিক্ত হন; তাঁর তিন ছেলে রানার, অরান ও আরিল্ডও খেলেছেন।
মানুষের ভালোবাসা ক্লাবটিকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। ২০১৬ সালে বোডো/গ্লিমট নরওয়ের শীর্ষ লিগ থেকে অবনমিত হয় এবং আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছিল। ২০২৫ সালে স্থানীয় খেলোয়াড় উন্নয়ন ও মাঠে সাফল্যের কারণে ক্লাবটি নরওয়ের সবচেয়ে ধনী ক্লাবের মর্যাদা অর্জন করে। ইন্টার মিলানের স্কোয়াড মূল্য ৬৬.৬৮ কোটি ইউরো হলেও বোডো/গ্লিমটের মূল্য মাত্র ৫.৭১ কোটি ইউরো।
বোডো/গ্লিমট স্থানীয় খেলোয়াড়দের উপর নির্ভরশীল। ২৭ জন খেলোয়াড়ের দলে ১৯ জন নরওয়েজিয়ান। কোচ কিয়েতিল নুটসেন ২০১৮ সাল থেকে ক্লাবের প্রধান কোচ। তাঁর নেতৃত্বে খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটছে, যা বড় ম্যাচগুলোতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বোডো শহরের মেয়র অড ইমিল ইনগেব্রিটসেন বলেন, ‘আমরা কঠোর পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত। এটি শহরের ইতিহাসেও প্রতিফলিত।’
বোডো শহরের রূপান্তরও ফুটবলের সাফল্যের সঙ্গে মিলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসের পর শহরটি এখন আধুনিক ও প্রাণবন্ত। ক্লাবের সাফল্যের সঙ্গে মিলিয়ে হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ বেড়েছে। হলুদ পতাকা এখন বোডোর অলিগলি ও ইউরোপিয়ান ফুটবলের মঞ্চে পতপত করছে।
সিএ/এমই


