মানবসভ্যতার সময় গণনার ইতিহাসে বহু পরিবর্তনের চেষ্টা হলেও শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে হাজার বছরের পুরোনো একটি পদ্ধতি। ১৭৯৩ সালের অক্টোবর মাসে ফরাসি প্রজাতন্ত্র সময়কে নতুনভাবে সাজানোর এক উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেয়। তাদের পরিকল্পনায় এক দিনকে ২৪ ঘণ্টার বদলে ১০ ঘণ্টায় ভাগ করা হয়, প্রতিটি ঘণ্টা ১০০ মিনিট এবং প্রতিটি মিনিট ১০০ সেকেন্ডে নির্ধারণ করা হয়। এমনকি সপ্তাহও করা হয়েছিল ১০ দিনের। কিন্তু এই দশমিক সময়ব্যবস্থা খুব বেশিদিন টেকেনি। পুরোনো ঘড়িকে নতুন নিয়মে রূপান্তরের জটিলতা এবং ১০ দিন পরপর ছুটির কারণে সাধারণ মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় এটি দ্রুত পরিত্যক্ত হয়।
বর্তমান সময়ব্যবস্থার শিকড় প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে সুমেরীয়রা ৬০-ভিত্তিক গণনা পদ্ধতি ব্যবহার করত, যাকে সেক্সাজেসিমাল বলা হয়। মানুষের হাতের আঙুলের গাঁট গুনে ১২ পর্যন্ত গণনা এবং অন্য হাতের আঙুল দিয়ে তা চিহ্নিত করে ৬০ পর্যন্ত পৌঁছানোর একটি পদ্ধতি ছিল, যা এই ভিত্তি বেছে নেওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা হয়।
এই ৬০ সংখ্যার বিশেষত্ব হলো এটি বহু সংখ্যায় নিঃশেষে বিভাজ্য—১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০ ও ৩০। ফলে হিসাব রাখা সহজ ছিল। কৃষিকাজ, কর নির্ধারণসহ বিভিন্ন কাজে সুমেরীয়রা মাটির ট্যাবলেটে এই পদ্ধতি ব্যবহার করত।
পরবর্তীতে প্রাচীন মিসরীয়রা দিনকে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করার ধারণা দেয়। তারা রাতকে ১২ ভাগে বিভক্ত করেছিল এবং পরে দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। সূর্যঘড়ি ও জলঘড়ির ব্যবহার এই সময় গণনাকে আরও নির্ভুল করে তোলে।
ব্যাবিলনীয়রা সুমেরীয়দের ৬০-ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করে এবং জ্যোতির্বিদ্যায় তা প্রয়োগ করে। তারা সময়কে ছোট ছোট এককে ভাগ করতে গিয়ে ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ডের ধারণা তৈরি করে। পরে গ্রিকরা এই পদ্ধতি গ্রহণ করে এবং বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে তা আরও বিস্তৃত করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ির প্রযুক্তিও উন্নত হয়েছে। ১২ শতকে যান্ত্রিক ঘড়ি, ১৮ শতকে মিনিটের কাঁটা এবং ২০ শতকে পারমাণবিক ঘড়ির আবিষ্কার সময় পরিমাপকে অত্যন্ত নিখুঁত করে তোলে। আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন স্মার্টফোন ও জিপিএস, এই সেকেন্ডের ওপরই নির্ভরশীল।
যদিও সেকেন্ডের নিচের এককে দশমিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, তবু ঘণ্টা ও মিনিটের ক্ষেত্রে সেই প্রাচীন ৬০-ভিত্তিক পদ্ধতিই এখনো বহাল রয়েছে। এটি মানব ইতিহাসের এমন এক ঐতিহ্য, যা আজও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সিএ/এমআর


