সমুদ্র ও সমুদ্রতল এখনো মানবজাতির কাছে এক গভীর রহস্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা মহাকাশ সম্পর্কে যতটা জেনেছি, সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে ততটা জানি না। এর প্রধান কারণ হলো সমুদ্রের গভীরে প্রচণ্ড চাপ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ফলে অনেক প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ অংশজুড়ে রয়েছে পানি। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ পানি কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল গবেষকের মতে, পৃথিবী গঠনের সময় থেকেই পানি উপস্থিত ছিল। অন্যদিকে আরেকদল মনে করেন, পরবর্তীতে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাতের মাধ্যমে পানি এসেছে। এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
সমুদ্রজগতের আরেকটি রহস্যজনক বিষয় হলো ওর্কা তিমির আচরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে কয়েক বছর ধরে গ্রেট হোয়াইট হাঙরের মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোর লিভার অনুপস্থিত। গবেষকদের ধারণা, কিছু ওর্কা হাঙরকে বিশেষ কৌশলে আক্রমণ করে তাদের লিভার খেয়ে ফেলছে। তবে কেন তারা এই আচরণ করছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
জাপানের ইয়োনাগুনি দ্বীপের কাছে সমুদ্রের তলদেশে পাওয়া গেছে রহস্যময় পাথরের গঠন, যা ‘ইয়োনাগুনি মনুমেন্ট’ নামে পরিচিত। এটি মানুষের তৈরি প্রাচীন স্থাপনা নাকি প্রাকৃতিকভাবে গঠিত শিলা—এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
সমুদ্রের তলদেশে অদ্ভুত শব্দ শোনার ঘটনাও দীর্ঘদিনের রহস্য। ১৯৯৭ সালে রেকর্ড হওয়া ‘ব্লুপ’ নামে পরিচিত এক বিশাল শব্দ একসময় অজানা ছিল, যদিও পরে ধারণা করা হয় এটি বরফখণ্ড ভাঙার শব্দ। এছাড়া ‘দ্য পিং’ নামের আরেকটি রহস্যময় শব্দও গবেষণার বিষয় হয়ে আছে।
সমুদ্রতলের গঠন সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু ধারণা পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত সমুদ্রতলের অর্ধেকেরও কম অংশের নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। সম্পূর্ণ মানচিত্র তৈরি করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তন, স্রোত ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে, তবে এর বড় একটি অংশ কোথায় যাচ্ছে, তা অজানা। কিছু প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে, কিন্তু বাকি অংশের অবস্থান এখনো গবেষণার বিষয়।
সমুদ্রের গভীরে অনেক প্রাণী নিজেদের শরীর থেকে আলো তৈরি করতে পারে, যাকে বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্স। এই আলো তারা শিকার ধরতে, সঙ্গী খুঁজতে বা শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে ব্যবহার করে। তবে এই বৈশিষ্ট্য কেন তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে সমুদ্র এখনো অজানায় ভরা এক জগৎ। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ভবিষ্যতে এসব রহস্যের উত্তর মিলবে, তবে আপাতত সমুদ্র আমাদের সামনে অসংখ্য প্রশ্ন রেখে চলেছে।
সিএ/এমআর


