প্রযুক্তি কেবল যন্ত্র বা অ্যালগরিদমের সমষ্টি নয়, বরং মানবসমাজের চিন্তা, ভাষা, অর্থনীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই বাস্তবতার মাঝেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা, বিভ্রান্তি ও মুনাফাকেন্দ্রিক প্রচারণা—যাকে অনেকেই ‘এআই হাইপ’ হিসেবে আখ্যা দেন। প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব থাকলে যেকোনো উদ্ভাবনই ক্ষমতার খেলায় রূপ নিতে পারে, যেখানে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে ব্যবহার করে গড়ে ওঠে নতুন শোষণ কাঠামো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক কিংবা জেনারেটিভ মডেল—এসব প্রযুক্তির বাস্তব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে মানুষ সহজেই মিথ্যা প্রত্যাশার ফাঁদে পড়ে। ফলে প্রযুক্তির প্রকৃত সক্ষমতা ও সীমা বোঝার জন্য সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি হয়ে ওঠে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিকড় বহু পুরোনো হলেও আধুনিক গবেষণার সূচনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রতীকভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে। পরবর্তীতে তথ্যের প্রাচুর্য ও জিপিইউ প্রযুক্তির উন্নয়নে মেশিন লার্নিং নতুন গতি পায়। ২০১১ সালে অ্যালেক্স ক্রিজেভস্কি, ইলিয়া সুতসকেভার ও জিওফ্রে হিন্টনের তৈরি নিউরাল নেটওয়ার্ক ইমেজনেট প্রতিযোগিতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলে এআই গবেষণার ধারা বদলে যায়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেনএআই পরবর্তীতে চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত করে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। অল্প সময়েই জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করে এবং এর বাজারমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিকে ঘিরে অতিরঞ্জিত প্রচারণাও সমানভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞ অরবিন্দ নারায়ণন ও সায়াশ কাপুর তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এর অর্থ ও সক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তি। জেনারেটিভ এআই যেখানে ইনপুটের ভিত্তিতে নতুন কনটেন্ট তৈরি করে, সেখানে প্রেডিক্টিভ এআই ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারে—এমন দাবি এখনো বিতর্কিত। তাঁদের মতে, জেনারেটিভ এআই এখনো অপরিণত এবং প্রেডিক্টিভ এআই বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
এদিকে প্রযুক্তিকে ঘিরে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বই ও আলোচনারও বিস্তার ঘটেছে। রে কার্জওয়েল, ইউভাল নোয়া হারারি কিংবা হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ব্যক্তিত্বরা এআই ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা তত্ত্ব উপস্থাপন করছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এসব ধারণার অনেকটাই অতিরঞ্জিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এআইকে সর্বশক্তিমান বা সর্বজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা জনমনে ভয়, বিভ্রান্তি ও অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি করে। এর ফলে বাজারে বিনিয়োগ বাড়ে, কিন্তু প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা আড়ালে থেকে যায়। একইসঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এর প্রভাব পড়ে।
২০২৩ সালে স্যাম অল্টম্যান যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা বাড়ালেও নতুন প্রতিযোগীদের জন্য বাধা তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই যদি যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই সমাজে প্রয়োগ করা হয়, তবে তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে একইসঙ্গে তারা মনে করেন, বিদ্যমান সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো দিয়েই এসব ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, এআই নিয়ে অযথা আতঙ্ক বা অতিরঞ্জিত আশাবাদ—দুটিই ক্ষতিকর। প্রযুক্তিকে তার প্রকৃত সীমা ও সক্ষমতার মধ্যে বুঝে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সিএ/এমআর
ছবি: সংগৃহীত
সূত্র: ইউভাল নোয়া হারারি, নেক্সাস: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব ইনফরমেশন নেটওয়ার্কস ফ্রম দ্য স্টোন এজ টু এআই; রে কার্জওয়েল, দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ারার: হোয়েন উই মার্জ উইথ এআই; হেনরি এ. কিসিঞ্জার, ক্রেইগ মুন্ডি ও এরিক শ্মিট, জেনেসিস: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, হোপ, অ্যান্ড দ্য হিউম্যান স্পিরিট; অরবিন্দ নারায়ণন ও সায়াশ কাপুর, এআই স্নেক অয়েল
সিএ/এমআর


