পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে জীবন কেমন হতে পারে—এই প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলের অন্যতম বিষয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করা নভোচারীদের দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেকটাই ভিন্ন এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সেখানে মাধ্যাকর্ষণ বল প্রায় অনুপস্থিত থাকায় সবকিছুই ভেসে থাকে, এমনকি মানুষ নিজেও। ফলে হাঁটা, বসা বা শোয়ার মতো সাধারণ কাজগুলোও করতে হয় ভিন্নভাবে।
মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীদের দিন শুরু হয় নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী। সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে তারা দ্রুত প্রস্তুতি নেন এবং কনফারেন্সে অংশ নেন। এরপর সকালের খাবার সেরে শুরু হয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিভিন্ন পরীক্ষামূলক কাজ, যা দিনের বড় অংশজুড়ে চলে। দুপুরে নির্দিষ্ট সময় খাবার গ্রহণের পর আবার শুরু হয় কাজ। সন্ধ্যায় পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও দিনের কাজের মূল্যায়ন করা হয়।
মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় খাবার গ্রহণেও রয়েছে ভিন্নতা। খাবারগুলো বিশেষভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পানি বা তাপ দিয়ে খাওয়ার উপযোগী করা হয়। পাউরুটির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় রুটি, যাতে ভাঙা কণা ভেসে বেড়িয়ে সমস্যা সৃষ্টি না করে। খাওয়ার সময় খাবার ভেসে বেড়ায়, আর নভোচারীরা সেটি মুখে নিয়ে খান।
দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও সহজ নয়। দাঁত ব্রাশ করার সময় পানির ব্যবহার সীমিত হওয়ায় টুথপেস্টের ফেনা গিলে ফেলতে হয়। গোসলের ক্ষেত্রেও পানি শরীরে মেখে শুকনা তোয়ালে দিয়ে মুছে নিতে হয়। বিশেষ ধরনের সাবান ব্যবহার করা হয়, যা ফেনা তৈরি করে না।
টয়লেট ব্যবস্থাও ভিন্নধর্মী। বিশেষভাবে ডিজাইন করা ছোট জায়গায় বসে বেল্ট দিয়ে নিজেকে স্থির রাখতে হয়। বর্জ্য শোষণ করে সংগ্রহ করা হয় এবং পরে তা নির্দিষ্টভাবে নিষ্পত্তি করা হয়।
ঘুমানোর সময় নভোচারীরা স্লিপিং ব্যাগ ব্যবহার করেন, যা মহাকাশযানের সঙ্গে আটকে রাখা থাকে যাতে ভেসে না যায়। মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় নাক ডাকার মতো সমস্যাও থাকে না।
শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে প্রতিদিন ব্যায়াম করা বাধ্যতামূলক। কারণ, দীর্ঘদিন ওজনহীন অবস্থায় থাকলে হাড় ক্ষয় ও পেশির দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। এজন্য মহাকাশ স্টেশনে ট্রেডমিল ও অন্যান্য ব্যায়াম সরঞ্জাম থাকে।
বিনোদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। শূন্যে ভেসে থাকা, একাধিক সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, সিনেমা দেখা কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার—সব মিলিয়ে মহাকাশ জীবন একদিকে যেমন বৈজ্ঞানিক, তেমনি কিছুটা রোমাঞ্চকরও।
ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক মহাকাশ ভ্রমণ চালু হলে সাধারণ মানুষও এমন অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিএ/এমআর


