একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে এটি মানুষের আবেগ বা পক্ষপাতমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষম প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে—এই প্রযুক্তিই অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যকে আরও জোরালোভাবে পুনরুত্পাদন করছে। এই সমস্যাটিই অ্যালগরিদমিক বায়াস নামে পরিচিত।
এআই যেহেতু বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়, তাই সেই তথ্যের ভেতরে যদি সমাজের বিদ্যমান বৈষম্য বা পক্ষপাত লুকিয়ে থাকে, তবে প্রযুক্তিটিও তা শিখে নেয় এবং আরও শক্তিশালীভাবে প্রয়োগ করে। ফলে প্রযুক্তি কেবল নিরপেক্ষ হাতিয়ার না থেকে সামাজিক বৈষম্যের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠছে।
অ্যালগরিদমিক বায়াসের মূল কারণ হিসেবে মেশিন লার্নিং পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখ করা হয়। ‘গারবেজ ইন, গারবেজ আউট’ নীতির কারণে যদি পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দিয়ে কোনো অ্যালগরিদম প্রশিক্ষিত হয়, তবে তার সিদ্ধান্তেও সেই পক্ষপাত প্রতিফলিত হবে। এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং সমাজের বিদ্যমান বৈষম্যের ডিজিটাল প্রতিফলন।
বিশ্বজুড়ে এর বেশ কিছু উদাহরণ সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত একটি অ্যালগরিদম অপরাধ পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি নির্ধারণে কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একইভাবে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ-সংক্রান্ত এআই পূর্বের ডেটার ভিত্তিতে নারীদের আবেদন কম গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
এই ধরনের বৈষম্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যাংকিং বা ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যদি অ্যালগরিদম সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে একটি বড় জনগোষ্ঠী আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট মতাদর্শে সীমাবদ্ধ রাখে, যা সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। কারণ স্থানীয় ডেটার অভাবে বিদেশি এআই মডেলের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে আঞ্চলিক ভাষাভাষী মানুষ প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
এই সংকট মোকাবিলায় ডেটার বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা, অ্যালগরিদমের নিয়মিত নিরীক্ষা এবং নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তিকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
সিএ/এমআর


