আকারে ছোট হলেও বিছানার কোণায় লুকিয়ে থাকা রক্তচোষা পরজীবী ছারপোকা মানুষের জন্য বেশ বিরক্তিকর। রাতের ঘুম নষ্ট করা এই পোকাগুলো মানুষকে যেমন অস্বস্তিতে ফেলে, তেমনি বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রেও রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, ছারপোকাদের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ পানি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড–এর গবেষকেরা ছারপোকার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, এসব পোকা ভেজা জায়গা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে চায়। বিশেষ করে পানির সংস্পর্শে এলে তারা দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। পূর্ণবয়স্ক ছারপোকার পাশাপাশি বয়সে ছোট ছারপোকাদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়, যদিও ছোটগুলো ভেজা জায়গা এড়িয়ে চলায় তুলনামূলক বেশি দক্ষ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গবেষণা শুধু ছারপোকাদের আচরণ সম্পর্কে নতুন তথ্যই দেয়নি, বরং ভবিষ্যতে এদের দমনের পদ্ধতি আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল জার্নাল অফ ইথোলজি–তে।
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ছারপোকা স্বভাবগতভাবেই ভেজা পরিবেশ এড়িয়ে চলে। তাই তরল কীটনাশক তৈরি ও ব্যবহারের সময় এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি, যাতে কীটনাশক প্রয়োগ করা ভেজা জায়গা থেকে তারা পালিয়ে যেতে না পারে।
গবেষণার সূচনা হয়েছিল এক আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে। কীটতত্ত্ববিদ ডং হওয়ান চো তার ল্যাবরেটরিতে ছারপোকাদের রক্ত খাওয়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে সময় ব্যবহৃত যন্ত্র থেকে কিছু রক্ত লিক হয়ে ছারপোকার পাত্রে পড়ে যায়। তিনি লক্ষ্য করেন, পাত্রের ভেতরের ছারপোকাগুলো ভেজা রক্তের কাছাকাছি না গিয়ে উল্টো দূরে সরে যাচ্ছে।
এক বিবৃতিতে গবেষক চো বলেছেন, “লিক হওয়া রক্ত পাত্রের উপরের কাগজটিকে ধীরে ধীরে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম ছারপোকাগুলো কাগজ থেকে রক্ত পেয়ে খুশি মনে তা পান করবে। তবে আমি দেখলাম একদম উল্টো। এরা রক্তের কারণে ভেজা কাগজের অংশটি সক্রিয়ভাবে এড়িয়ে চলছিল। ভেজা জায়গার আশপাশেও যাচ্ছিল না এরা।”
এই ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গবেষকেরা পানিভেজা কাগজ দিয়ে আরও পরীক্ষা চালান এবং একই ধরনের আচরণ লক্ষ্য করেন। পরে তারা ছোট-বড় ও স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে বিভিন্ন ধরনের ছারপোকার চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, ছারপোকা শুকনো জায়গার তুলনায় ভেজা জায়গায় খুব কম সময় কাটায়। প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পানির সংস্পর্শে আসার আগেই তারা ভেজা জায়গা ছেড়ে দূরে সরে যায়। অন্যদিকে পূর্ণবয়স্ক ছারপোকার তুলনায় বাচ্চা ছারপোকা বা নিম্ফ পানির কাছ থেকে সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি সক্রিয়।
গবেষকদের মতে, ছারপোকাদের শরীর চ্যাপ্টা আকৃতির হওয়ায় পানির আঠালো স্তর তাদের পেটের নিচে থাকা স্পাইরাকল বা শ্বাসছিদ্র বন্ধ করে দিতে পারে। এই ছিদ্রগুলোর মাধ্যমেই তারা শ্বাস নেয়, যা মানুষের ফুসফুসের মতো কাজ করে। ফলে সামান্য পরিমাণ পানিও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ছারপোকা দমনের ক্ষেত্রেও এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ছারপোকা প্রায় নির্মূল হয়ে গেলেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আবারও এগুলোর বিস্তার দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক কীটনাশকের বিরুদ্ধে এদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, কেবল রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত দমন ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে তরল কীটনাশক ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকা দরকার, কারণ তাৎক্ষণিকভাবে পোকা মারা না গেলে ছারপোকা ভেজা জায়গা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গিয়ে আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সিএ/এমআর


