যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের সামরিক সক্ষমতা আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিপুল মিসাইল ও ড্রোন শক্তিকে কেন্দ্র করেই ইরান তাদের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আক্রমণের কৌশল সাজিয়েছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক চাপের মুখে ইরান নিজেদের তৈরি মিসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখছে। এসব অস্ত্র দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক কৌশল মূলত একটি স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রচলিত বিমানবাহিনীর সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে নিতে তারা মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখা উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের কারণে হামলার মধ্যেও এসব ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়।
ব্যালিস্টিক মিসাইল শক্তি ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি। স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার এসব মিসাইলের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি করেছে দেশটি। দ্রুত পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে ফাতাহ-১১০, জোলফাগার ও কিয়াম-১ ধরনের মিসাইল বেশি ব্যবহৃত হয়। সলিড জ্বালানিচালিত হওয়ায় এগুলো সহজে পরিবহনযোগ্য এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই মোতায়েন ও উৎক্ষেপণ করা যায়।
মধ্যম পাল্লার ক্ষেত্রে খোররামশাহর, ইমাদ এবং গাদার সিরিজের মিসাইল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে খোররামশাহর মিসাইল প্রায় দেড় হাজার কেজি ওজনের যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারে এবং প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে জানা যায়।
নতুন প্রজন্মের ফাত্তাহ সিরিজের মিসাইলে ম্যানুয়েভারেবল রিএন্ট্রি ভেহিকল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছানোর শেষ মুহূর্তে মিসাইল নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একে প্রতিহত করা কঠিন করে তোলে। এসব মিসাইলের গতি শব্দের চেয়ে ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেশি এবং পাল্লা প্রায় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যালিস্টিক মিসাইলের পাশাপাশি ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তিও ইরানের সামরিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাভেহ, সুমার ও হোভেইজেহ ধরনের ক্রুজ মিসাইল ভূমির কাছাকাছি উড়ে এবং ভূপ্রকৃতির ভাঁজ অনুসরণ করে চলতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রাডারের নজর এড়িয়ে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও ইরান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। বিশেষ করে শাহেদ সিরিজের লয়টারিং মিউনিশন ড্রোন দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করে আক্রমণ চালাতে পারে। উন্নত ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে এসব ড্রোন আড়াই হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম এবং প্রায় ৫০ কেজি ওজনের যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারে।
সাধারণত এসব ড্রোন একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে উৎক্ষেপণ করা হয়, যাতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো তুলনামূলক সহজে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ইরানের সামরিক কৌশলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাটির নিচে তৈরি বিশাল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক, যাকে প্রায়ই ‘মিসাইল সিটি’ বলা হয়। এসব সুরক্ষিত টানেলে মিসাইল ও উৎক্ষেপণ যন্ত্র সংরক্ষণ করা হয়। ফলে আকাশপথে হামলা চালিয়ে উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করার চেষ্টা হলেও ইরান পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ছড়িয়ে থাকা সামরিক অবকাঠামো, মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে ইরান এমন একটি কৌশল তৈরি করেছে, যার লক্ষ্য সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধের খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া।
সিএ/এমআর


