ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতে ভবিষ্যতে অপারেশন থিয়েটারে দেখা যেতে পারে গ্লু গান। স্কুলের প্রজেক্ট বা ক্র্যাফটের কাজে ব্যবহৃত এই সাধারণ যন্ত্রই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, বিশেষভাবে পরিবর্তিত গ্লু গান ব্যবহার করে বড় ধরনের হাড়ের ক্ষত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সারানো সম্ভব হতে পারে।
নিউ সায়েন্টিস্টসহ বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকিউঙ্কওয়ান ইউনিভার্সিটির গবেষক জং সেউং লি ও তাঁর দল এই অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। সাধারণত গ্লু গান ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে কাজ করে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তবে গবেষকেরা এই গ্লু গানের তাপমাত্রা কমিয়ে প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এনেছেন, যাতে অপারেশনের সময় শরীরের কোনো ক্ষতি না হয়।
মানবদেহে ছোটখাটো হাড়ের ফাটল বা চিড় স্বাভাবিকভাবেই সেরে ওঠে। কিন্তু বড় দুর্ঘটনা বা টিউমার অপারেশনের পর হাড়ে বড় গর্ত তৈরি হলে তা নিজে নিজে সারতে পারে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম প্লাগ বা থ্রি-ডি প্রিন্ট করা কাঠামো ব্যবহার করা হয়। তবে থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় জরুরি অপারেশনে তা সব সময় সম্ভব হয় না। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হিসেবেই গ্লু গানের এই নতুন ব্যবহার।
গবেষকেরা যে জৈবিক আঠা তৈরি করেছেন, তার প্রধান উপাদান হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট ও পলিক্যাপ্রোল্যাকটোন। মানুষের স্বাভাবিক হাড়ের প্রায় অর্ধেকই হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট দিয়ে গঠিত। আর পলিক্যাপ্রোল্যাকটোন একটি বায়োডিগ্রেডেবল থার্মোপ্লাস্টিক, যা শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে ভেঙে যায়। সার্জনরা এই আঠা ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাড়ের গর্ত পূরণ করতে পারেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের কোষ সেখানে গড়ে উঠে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে।
গবেষক জং সেউং লি বলেন, ‘এটা মূলত বাজারে পাওয়া সাধারণ গ্লু গান দিয়েই তৈরি। এতে আমাদের সময় এবং খরচ উভয়ই বাঁচে।’ পরীক্ষামূলকভাবে খরগোশের পায়ের হাড়ে এক সেন্টিমিটার গর্ত পূরণ করে দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহ পর সেখানে কোনো ফাঁক বা জটিলতা তৈরি হয়নি। বরং প্রচলিত বোন সিমেন্টের তুলনায় হাড়ের ঘনত্ব দ্বিগুণেরও বেশি পাওয়া গেছে।
সংক্রমণ প্রতিরোধে এই আঠার সঙ্গে ভ্যানকোমাইসিন ও জেন্টামাইসিন নামের দুটি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ওষুধ মেশানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ওষুধগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে জীবাণু ধ্বংস করে। যদিও কেউ কেউ মনে করছেন, ভবিষ্যতে থ্রি-ডি প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে এটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, তবুও জরুরি পরিস্থিতিতে গ্লু গান দিয়ে হাড় জোড়া লাগানোর ধারণাকে সম্ভাবনাময় বলেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিএ/এমআর


