মাথাব্যথা মানুষের সবচেয়ে পরিচিত শারীরিক সমস্যাগুলোর একটি। প্রায় সব বয়সের মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মাথাব্যথার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। সাধারণভাবে মাথাব্যথাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়—সাধারণ মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেন। এই প্রতিবেদনে মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
মাথাব্যথার তীব্রতা কখনো ধারালো ছুরির মতো, কখনো আবার ভেতরে ভেতরে ধুকপুক করা অনুভূতি তৈরি করে। এতে পুরো দিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতে পারে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের মস্তিষ্ক নিজে কোনো ব্যথা অনুভব করতে পারে না। তাহলে মাথাব্যথার সময় মাথার ভেতর চাপ পড়া বা ফেটে যাওয়ার মতো অনুভূতি আসে কেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথাব্যথার পেছনে একাধিক উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। শরীরের স্নায়ুগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ব্যথার খবরও এই সংকেতের মাধ্যমেই মস্তিষ্কে পৌঁছে। যদিও মস্তিষ্কের ভেতরে ব্যথা অনুভব করার মতো কোনো স্নায়ু নেই, তবে মাথার রক্তনালি, স্নায়ু এবং মস্তিষ্ককে ঘিরে থাকা সুরক্ষামূলক গঠনগুলো ব্যথার সংকেত গ্রহণ করতে পারে। এসব স্থানে আঘাত বা পরিবর্তন হলে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা স্নায়ুকে সক্রিয় করে ব্যথার বার্তা মস্তিষ্কে পাঠায়।
মস্তিষ্ক শুধু ব্যথার সংকেত গ্রহণই করে না, বরং সেই সংকেতের প্রতিক্রিয়ায় শরীরে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেওয়ার নির্দেশও দেয়। তাই মাথাব্যথার সঙ্গে অনেক সময় চোখে পানি আসা, নাক দিয়ে পানি পড়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি ভাব বা আলো ও শব্দে অস্বস্তির মতো সমস্যাও দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব উপসর্গ মানুষকে নিজের জীবনযাপনের দিকে আরও মনোযোগী হতে বাধ্য করে, যা ভবিষ্যতে মাথাব্যথার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শারীরিক ও মানসিক চাপ মাথাব্যথার অন্যতম বড় কারণ। সংক্রমণ, অ্যালার্জি, হরমোনের ওঠানামা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, পানি কম খাওয়া, খাবার বাদ দেওয়া কিংবা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সময় অনেকের মাথাব্যথা বেড়ে যায়। এমনকি আবহাওয়ার পরিবর্তনে সাইনাসে চাপ পড়লেও মাথাব্যথা শুরু হতে পারে।
মাইগ্রেন সাধারণ মাথাব্যথার চেয়ে বেশি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। মাইগ্রেনে আক্রান্ত হলে মাথার একপাশে বা ভেতরে তীব্র ব্যথা, বমি ভাব, আলো ও শব্দে অসহ্যতা দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মাইগ্রেনের সঙ্গে সেরোটোনিন ও ইস্ট্রোজেন নামের হরমোনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই হরমোনগুলোর মাত্রা পরিবর্তিত হলে মস্তিষ্কের কিছু অতিসংবেদনশীল স্নায়ু অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের ওঠানামা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয় বলে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার হারও বেশি। এ ছাড়া জিনগত কারণেও অনেকের মাইগ্রেনের ঝুঁকি জন্মগতভাবে বেশি থাকে। তাই পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে এই সমস্যার উপস্থিতি দেখা যায়।
মাথাব্যথার ধরন সঠিকভাবে শনাক্ত করা চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত খাবার ও ঘুম, অতিরিক্ত ক্যাফেইন পরিহার এবং নিয়মিত শরীরচর্চা মাথাব্যথার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। হালকা ব্যথায় সাধারণ ব্যথানাশক কাজ করলেও তীব্র বা ঘন ঘন মাথাব্যথার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্রুত সমস্যা শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করলে কষ্ট কমে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
সিএ/এমআর


