২০৫০ সাল। মহাকাশ পর্যটনে বেরিয়েছেন আপনি। বিশাল এক বিলাসবহুল স্পেস হোটেলে অবস্থান। জানালার বাইরে নীল গ্রহ পৃথিবী। হঠাৎ হোটেলের গাইড আপনাকে নিয়ে গেল হোটেলের সঙ্গে যুক্ত একটি পুরোনো, সরু ও জংধরা ধাতব কাঠামোর সামনে। গাইড জানাল, এটাই সেই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, যেখানে মানুষ টানা ২৫ বছরেরও বেশি সময় মহাকাশে বসবাস করেছে। জায়গাটি ছোট, তার ও পাইপে ভরা, কিন্তু মানুষের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
এই দৃশ্য কল্পনাপ্রসূত মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। নাসার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন, এত ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কি সত্যিই ধ্বংস করা জরুরি? একে কি বিশ্বের প্রথম মহাকাশ জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা যায় না?
গত ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ছিল পৃথিবীর বাইরে মানুষের একমাত্র স্থায়ী আবাস। তবে দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে এর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ান অংশে ফাটল ও বাতাস লিকের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এসব কারণেই নাসা ২০৩১ সালে স্টেশনটি অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে প্রায় ৪১০ কিলোমিটার ওপরে ঘুরছে। এই কক্ষপথে বাতাস খুবই কম হলেও সামান্য বাধার কারণে স্টেশনটির গতি ধীরে ধীরে কমে আসে। নিয়মিত ধাক্কা দিয়ে একে ওপরে ধরে রাখতে হয়। তা না হলে এটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পৃথিবীতে আছড়ে পড়তে পারে, যা মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।
নাসার পরিকল্পনা হলো, নিয়ন্ত্রিতভাবে স্টেশনটিকে প্রশান্ত মহাসাগরের পয়েন্ট নিমো নামের নির্জন এলাকায় ফেলে দেওয়া। তবে আইনপ্রণেতারা প্রস্তাব দিয়েছেন, একে আরও ওপরে একটি নিরাপদ কক্ষপথে পাঠিয়ে স্থায়ীভাবে ঘুরতে দেওয়া হোক। সেখানে বাতাসের বাধা না থাকায় এটি দীর্ঘদিন অক্ষত থাকতে পারে।
তবে এই কাজ সহজ নয়। বর্তমানে সয়ুজ বা ড্রাগন ক্যাপসুল দিয়ে সামান্য কক্ষপথ সংশোধন করা হয়। পুরো স্টেশনকে অনেক ওপরে তুলতে বিপুল জ্বালানি ও অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির স্পেস আর্কিওলজিস্ট অধ্যাপক অ্যালিস গরম্যান মনে করেন, যদি এটি সংরক্ষণ করা যায়, তবে তা হবে ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাঁর মতে, নথিতে লেখা তথ্যের বাইরে বাস্তবে মানুষ কীভাবে মহাকাশে বসবাস করেছে, তা জানার অনন্য সুযোগ দেবে এই স্টেশন। তবে তাঁর মতেও, এত ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন। শেষ পর্যন্ত নাসা হয়তো এই প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয় বলেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সিএ/এমআর


