গতির জগতে নানা রকম বৈচিত্র্য রয়েছে। কোনো গতি সরল, কোনোটি জটিল, আবার কোনো গতি নির্দিষ্ট সময় পরপর একই অবস্থায় ফিরে আসে। এ ধরনের গতিকে বলা হয় পর্যাবৃত্ত গতি। তবে সব পর্যাবৃত্ত গতি সরল ছন্দিত গতি নয়। পর্যাবৃত্ত গতির একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ রূপই হলো সরল ছন্দিত গতি।
সরল ছন্দিত গতি হচ্ছে এমন এক ধরনের স্পন্দন বা দোলন গতি, যেখানে কোনো বস্তু একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দুই পাশে নিয়মিতভাবে সামনে-পেছনে বা ডানে-বাঁয়ে দুলতে থাকে। এই নির্দিষ্ট বিন্দুটিকে বলা হয় সাম্যবিন্দু বা কেন্দ্রবিন্দু। বস্তুটি যখন এই কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে, তখন এর বেগ সর্বাধিক থাকে।
কেন্দ্রবিন্দু থেকে বস্তুটি যত দূরে সরে যায়, তার বেগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছে বস্তুর বেগ শূন্য হয়ে যায়। এই অবস্থানকে বলা হয় বিস্তার বা চরম বিন্দু। এরপর বস্তুটি আবার বিপরীত দিকে কেন্দ্রবিন্দুর দিকে ফিরে আসে এবং ফেরার পথে তার বেগ বাড়তে থাকে। কেন্দ্রবিন্দু অতিক্রম করার পর জড়তার কারণে বস্তুটি আবার অন্য দিকে এগিয়ে যায় এবং একই প্রক্রিয়া বারবার ঘটতে থাকে।
সরল ছন্দিত গতির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো সরল দোলক। একটি সুতোয় কোনো ভারী বস্তু ঝুলিয়ে দিলে সেটি ডানে-বাঁয়ে দুলতে থাকে। দোলকের ঠিক মাঝের খাড়া অবস্থানটাই হলো সাম্যবিন্দু। গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের পেন্ডুলামের গতি কিংবা শিশুর দোলনার গতি সরল ছন্দিত গতির পরিচিত উদাহরণ।
এই গতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সূচনা হয় গ্যালিলিও গ্যালিলির মাধ্যমে। গির্জায় ঝুলন্ত ঝাড়বাতির দোলন লক্ষ্য করে তিনি সরল দোলকের গতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেন। পরবর্তীতে স্প্রিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বস্তুর ওপর-নিচে দোলন কিংবা টিউনিং ফর্কে আঘাত করলে এর বাহুর কম্পন—সব ক্ষেত্রেই সরল ছন্দিত গতির প্রকাশ দেখা যায়।
পদার্থবিজ্ঞানে, বিশেষ করে শব্দবিজ্ঞানে সরল ছন্দিত গতির গুরুত্ব অপরিসীম। শব্দ কীভাবে উৎপন্ন হয় এবং বাতাসের অণুগুলো কীভাবে কম্পনের মাধ্যমে শব্দকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেয়, তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় এই গতির সূত্রের মাধ্যমে।
শুধু তাই নয়, বৈদ্যুতিক এসি কারেন্টেও সরল ছন্দিত গতির ধারণা প্রয়োগ করা হয়। এসি কারেন্টে বিদ্যুৎ প্রবাহ একবার সামনে, আবার পেছনের দিকে প্রবাহিত হয়, যা সরল ছন্দিত গতির নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতেও কণার তরঙ্গধর্ম ব্যাখ্যায় সরল ছন্দিত গতির ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সিএ/এমআর


