বাংলাদেশে ধানের ক্ষতিকর পোকা দমন করার নতুন পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ইকো-ইঞ্জিনিয়ারিং উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রির কীটতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানীরা ধানের ২৩২ প্রজাতির ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে ২০ থেকে ৩৩ প্রজাতির পোকা ধানের ফলনে মারাত্মক ক্ষতি ঘটায়। বোরো মৌসুমে এসব পোকার আক্রমণের কারণে ফলন প্রায় ১৫ শতাংশ, আউশে ২৪ শতাংশ এবং আমনে ১৮ শতাংশ কমে যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী রোগ ও পোকামাকড়ের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩৭ শতাংশ ধান নষ্ট হয়। বাংলাদেশে তিন মৌসুম মিলিয়ে গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ ধান এই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে, প্রাকৃতিক উপায়ে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ধানক্ষেতে ৩৭৫ ধরনের উপকারী বা বন্ধু পোকা বাস করে, যারা ক্ষতিকর পোকাদের দমন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ইকো-ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতিতে ধানের জমির আইলে বিভিন্ন রঙের ফুল, শাক-সবজি ও ফলের চাষ করা হয়, যা বন্ধু পোকাদের আকর্ষণ করে। বাদামি গাছফড়িং, সবুজ পাতাফড়িং, পাতামোড়ানো পোকা ও মাজরাপোকাসহ ক্ষতিকর পোকাদের শত্রু হিসেবে এই বন্ধু পোকারা কার্যকর। এরা ফুলের মধু খেয়ে শক্তি অর্জন করে এবং ক্ষতিকর পোকাদের খেয়ে ফেলে বা তাদের ডিমের ওপর ডিম পেয়ে ধ্বংস করে। উদাহরণ হিসেবে, ট্রাইকোগ্রামা জহিরি নামের পরজীবী পোকা পামরি পোকার ডিমের শতকরা ৮৭ ভাগ ধ্বংস করতে সক্ষম।
ব্রী’র গবেষকরা ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বোরো মৌসুমে এই পদ্ধতি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করেছেন। তারা দেখেছেন, জমিতে আইলে গাঁদা, কসমস ও সূর্যমুখী চাষ করলে ক্ষতিকর পোকা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়, কীটনাশক ব্যবহার প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব এবং ধানের ফলন ৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এই পদ্ধতি মাটির উর্বরতাও বৃদ্ধি করে।
ভিয়েতনাম, চীন ও ফিলিপাইনেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ধানের ক্ষতিকর পোকা দমনে উল্লেখযোগ্য সফলতা এসেছে। বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিওফ গুরের গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি ধানের উৎপাদনকে পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি কৃষকের খরচ কমাতে সহায়ক। বাংলাদেশের ছোট ছোট ধানক্ষেতে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা আরও বেশি সম্ভাবনাময়।
বাংলাদেশের কৃষকরা জমির আইলে ফুল, ডাল ও তেলজাতীয় ফসল চাষ করে প্রাকৃতিকভাবে পোকা দমন করতে পারেন এবং অতিরিক্ত আয়ও করতে পারেন। তবে এই প্রযুক্তি কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং কীটনাশক ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টা এখনও মূল চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশে কীটনাশকের বাজার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, এবং গত পাঁচ বছরে এর ব্যবহার ৮১.৫ শতাংশ বেড়েছে।
সিএ/এমআর


