ক্রিস্টোফার নোলানের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ইন্টারস্টেলার-এর সেই দৃশ্যটি এখনও অনেকের মনে দাগ কেটে আছে, যেখানে মিলার গ্রহে কাটানো মাত্র এক ঘণ্টা পৃথিবীর সাত বছরের সমান হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় টাইম ডাইলেশন বা কাল দীর্ঘায়ন। বাস্তবে এমন নাটকীয় পার্থক্য না হলেও আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের সব জায়গায় সময় একই গতিতে চলে না। আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলেও সময় পৃথিবীর তুলনায় সামান্য দ্রুত চলে বলে বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক গবেষণায় নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় মঙ্গলের ঘড়ি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ২৪ ঘণ্টা পার হলে মঙ্গলে সেই সময় ২৪ ঘণ্টার চেয়ে প্রায় ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ড বেশি হয়ে যায়। সময়ের এই পার্থক্য খুব সামান্য মনে হলেও মহাকাশ বিজ্ঞান ও নেভিগেশন প্রযুক্তিতে এর প্রভাব বড় হতে পারে।
এই সময়ের পার্থক্যের পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি। সময়ের গতি নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর—মহাকর্ষ বল এবং গতিবেগ। ভারী বস্তুর কাছাকাছি সময় ধীরে চলে। পৃথিবীর ভর মঙ্গলের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় এর মহাকর্ষ শক্তিশালী, ফলে পৃথিবীতে সময় কিছুটা ধীর গতিতে প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে মঙ্গলের ভর কম এবং মাধ্যাকর্ষণ দুর্বল, তাই সেখানে সময় অপেক্ষাকৃত দ্রুত চলে।
স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুযায়ী, যে বস্তু যত দ্রুতগতিতে চলবে, তার সময় তত ধীর হবে। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে মঙ্গলের চেয়ে দ্রুত গতিতে ঘোরে। এই কারণে পৃথিবীর সময় আরও ধীর হয়ে যায়। এই দুই প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে মঙ্গলের সময়কে পৃথিবীর তুলনায় এগিয়ে রাখে।
এই হিসাব নির্ণয় করা সহজ ছিল না। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির পদার্থবিদ নীল অ্যাশবি এবং বিজুনাথ পাটলা সূর্য, পৃথিবী, চাঁদ ও মঙ্গলের সম্মিলিত প্রভাব বিশ্লেষণ করেন, যাকে তাঁরা ফোর-বডি প্রবলেম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মঙ্গলের কক্ষপথ পৃথিবীর মতো গোলাকার নয়, বরং কিছুটা চ্যাপ্টা। ফলে সূর্যের কাছাকাছি গেলে এর গতি বাড়ে এবং দূরে গেলে কমে। এই কারণে সময়ের পার্থক্যও কখনো কমে, আবার কখনো বাড়ে। গড়ে এই পার্থক্য ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও কখনো তা ২২৬ মাইক্রোসেকেন্ড পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে।
ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানো এবং সেখানে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনায় এই সময়ের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পৃথিবীর জিপিএস ব্যবস্থা আলোর গতি ও সময়ের নিখুঁত হিসাবের ওপর নির্ভর করে। এক মাইক্রোসেকেন্ডে আলো প্রায় ৩০০ মিটার পথ অতিক্রম করে। মঙ্গলের জিপিএস ব্যবস্থায় যদি এই সময়ের হিসাব ঠিকভাবে সমন্বয় করা না হয়, তাহলে অবস্থান নির্ণয়ে বড় ধরনের ভুল দেখা দিতে পারে।
৫জি নেটওয়ার্ক ও মহাকাশ যোগাযোগেও সময়ের হিসাব অত্যন্ত সূক্ষ্ম হতে হয়। তাই ভবিষ্যতের যোগাযোগ ও নেভিগেশন ব্যবস্থাকে নির্ভুল রাখতে বিজ্ঞানীরা আগেভাগেই এই সময়ের পার্থক্য নির্ধারণ করছেন। এর আগে একই গবেষক দল চাঁদের ক্ষেত্রেও সময়ের পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন, যেখানে চাঁদের ঘড়ি পৃথিবীর তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৫৬ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে। এই গবেষণা ভবিষ্যতের আন্তগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করছে।
সিএ/এমআর


