ব্রিটেনের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী লেখক টেরি প্র্যাচেট তাঁর কল্পনাশক্তি, শাণিত রসবোধ ও নিখুঁত বর্ণনার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। পাঠককে যেমন হাসাতেন, তেমনি ভাবনাচিন্তার জগৎও প্রসারিত করতেন। তবে তাঁর সৃষ্টিশীলতার আড়ালে নীরবে বাসা বাঁধছিল এক জটিল স্নায়ুরোগ পোস্টেরিওর কর্টিক্যাল অ্যাট্রোফি, যা আলঝেইমারের একটি বিরল ধরন।
বর্তমানে এই রোগ চিকিৎসকদের কাছে পরিচিত হলেও কয়েক বছর আগেও বিষয়টি ছিল অনেকটাই অজানা। গবেষকদের দাবি, চিকিৎসকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ শনাক্ত করার প্রায় এক দশক আগেই টেরি প্র্যাচেটের লেখায় এই অসুখের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই সংকেত লুকিয়ে ছিল তাঁর উপন্যাসের ভাষা ও শব্দচয়নের ভেতরেই।
সাধারণভাবে ডিমেনশিয়া বলতে মানুষ স্মৃতিভ্রংশকে বোঝে। কিন্তু গবেষকদের মতে, রোগের প্রাথমিক আঘাত স্মৃতিতে নয়, বরং ভাষায় পড়ে। ধীরে ধীরে শব্দভাণ্ডার সীমিত হতে থাকে, বর্ণনার বৈচিত্র্য কমে আসে এবং লেখার ভঙ্গি হয়ে ওঠে একঘেয়ে। এসব পরিবর্তন এতটাই সূক্ষ্ম যে সাধারণ পাঠকের চোখে তা ধরা পড়ে না।
এই রহস্য উদঘাটনে যুক্তরাজ্যের লফবোরো ইউনিভার্সিটি ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক টেরি প্র্যাচেটের লেখা উপন্যাসগুলো বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা সময়ের সঙ্গে লেখকের ভাষাগত পরিবর্তন, বিশেষ করে বিশেষণের ব্যবহার কতটা কমেছে, তা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, প্র্যাচেটের শেষদিকের বইগুলোতে বিশেষণের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। এতে লেখার মান কমে যায়নি, তবে কম্পিউটার বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যে তাঁর লেখার আগের ‘রঙিন’ ও বৈচিত্র্যময় ভঙ্গি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় দ্য লাস্ট কন্টিনেন্ট উপন্যাসে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁকে ডিমেনশিয়া রোগী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রায় ১০ বছর আগে। অথচ এই বইতেই প্রথমবারের মতো শব্দভাণ্ডারের বৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়ার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশের বহু আগেই মস্তিষ্কে রোগের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়, যাকে প্রাক-লক্ষণ পর্যায় বলা হয়।
গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া শনাক্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বর্তমানে রোগ ধরা পড়তে অনেক দেরি হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে। লিকানেমাব বা ডোনাডিমাবের মতো নতুন কিছু ওষুধ রোগের গতি কমাতে পারে, তবে সেগুলো সবচেয়ে কার্যকর হয় রোগের একেবারে শুরুতে প্রয়োগ করা হলে।
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মানুষের ইমেইল, মেসেজ কিংবা লেখালেখি বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই সতর্ক সংকেত দেওয়া সম্ভব হতে পারে। রক্ত পরীক্ষা বা ব্রেইন স্ক্যান ছাড়াই যদি ভাষার পরিবর্তন দেখে রোগ শনাক্ত করা যায়, তবে বহু মানুষের জীবনমান রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টেরি প্র্যাচেট আজ আর আমাদের মাঝে নেই, তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর লেখাগুলো এখন বিজ্ঞানের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার হয়ে উঠেছে, যা প্রমাণ করে—শব্দও অনেক সময় মানুষের অজানা অসুখের বার্তা বহন করে |
সিএ/এমআর


