নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার ঘটনা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি। বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, একটি আপেল সরাসরি নিউটনের মাথায় পড়ার মাধ্যমেই মহাকর্ষ সূত্রের আবিষ্কার হয়েছিল। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঘটনাটি আংশিক সত্য হলেও মাথায় আপেল পড়ার বিষয়টি অতিরঞ্জিত। নিউটন গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখেছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু সেটি তাঁর মাথায় আঘাত করেছিল এমন তথ্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বিজ্ঞানের আবিষ্কারে হঠাৎ উদ্ভাসিত ধারণাকে ‘ইউরেকা মোমেন্ট’ বলা হয়। গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের বিখ্যাত ইউরেকা মুহূর্ত থেকেই এই ধারণার জন্ম। অনেকেই মনে করেন, নিউটনের ক্ষেত্রেও এমনই একটি মুহূর্ত ঘটেছিল। কিন্তু বাস্তবে মহাকর্ষ সূত্রের পেছনে ছিল শত শত বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ। গ্যালিলিও পড়ন্ত বস্তুর সূত্র ব্যাখ্যা করেন, কেপলার গ্রহের গতির নিয়ম আবিষ্কার করেন, কোপার্নিকাস সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে সূর্যের ধারণা দেন এবং ইবনে আল-হাইশাম ভর ও বলের আচরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। নিউটন এই সব জ্ঞানকে একত্র করে গাণিতিক কাঠামোয় রূপ দেন।
১৬৬৫ সালে প্লেগ মহামারির সময় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে নিউটন গ্রামে ফিরে যান। সেখানেই তিনি গভীরভাবে চিন্তাভাবনা ও গবেষণায় সময় দেন। বাগানে বসে আপেল পড়তে দেখার ঘটনা তাঁর মনে প্রশ্ন জাগিয়েছিল—কেন বস্তু নিচের দিকে পড়ে, ওপরে ওঠে না? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়েই তিনি মহাকর্ষের সূত্র গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তবে এই ধারণা একদিনে আসেনি; দীর্ঘ সময়ের বিশ্লেষণ, গণনা ও পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের গবেষণার সমন্বয়েই তা পূর্ণতা পায়।
নিউটনের ভাগনি ক্যাথরিন কন্ডুইটের মাধ্যমে এই আপেলের গল্পটি জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার তাঁর লেখায় ঘটনাটি উল্লেখ করলে তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পটি আরও রোমাঞ্চকর রূপ নেয় এবং মাথায় আপেল পড়ার সংস্করণটি প্রচলিত হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, একটি আপেল নিউটনের চিন্তার সূত্রপাত ঘটাতে পারে, কিন্তু মহাকর্ষ সূত্র ছিল বহু শতকের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার ফল।
সিএ/এমআর


