রান্নার সময় অনেকেই গরম কড়াইয়ে সামান্য পানি ছিটিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খুব বেশি গরম কড়াইয়ে পড়লে পানি সঙ্গে সঙ্গে বাষ্পে পরিণত না হয়ে মুক্তার মতো গোল আকার নিয়ে লাফাতে থাকে। কখনো কখনো পিংপং বলের মতো এদিক–সেদিক ঘুরে বেড়ায়। সাধারণত ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি ফুটে বুদবুদ তৈরি হয় এবং বাষ্পে পরিণত হয়। কিন্তু পাত্রের তাপমাত্রা যখন আরও অনেক বেশি বেড়ে যায়, তখন পানির আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠে। প্রায় ১৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় এই অদ্ভুত ঘটনা চোখে পড়ে।
অত্যন্ত উত্তপ্ত পৃষ্ঠে পানির ফোঁটা পড়লে ফোঁটার নিচের অংশ মুহূর্তেই বাষ্পে রূপান্তরিত হয়। এই বাষ্প পানির চারপাশে এক ধরনের অদৃশ্য আবরণ তৈরি করে। ফলে পানি সরাসরি গরম ধাতব পৃষ্ঠের সংস্পর্শে আসে না। বাষ্পের স্তরটি তাপ পরিবহণে দুর্বল হওয়ায় তাপ খুব ধীরে পানিতে পৌঁছায়। এর ফলে পানির ফোঁটা দ্রুত ফুটে না গিয়ে কিছু সময় ভেসে থাকে এবং লাফাতে থাকে।
এই বাষ্পের স্তরের কারণে পাত্রের সঙ্গে পানির ঘর্ষণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে। তাই ফোঁটাটি সহজেই নড়াচড়া করতে পারে এবং কড়াইয়ের ভেতরে ঘুরে বেড়ায়। ধীরে ধীরে বাষ্প শোষণ করে পানি বাষ্পীভূত হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে শুকিয়ে যায় না। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় লিডেনফ্রস্ট প্রভাব।
জার্মান বিজ্ঞানী জোহান গটলব লেইডেনফ্রস্ট ১৭৫৬ সালে প্রথম এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেন। যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এই প্রভাব শুরু হয়, তাকে বলা হয় লিডেনফ্রস্ট বিন্দু। কোন তরলে এই বিন্দু কত হবে, তা নির্ভর করে তরলের ধরন, ফোঁটার আকার এবং পাত্রের পৃষ্ঠের উপাদানের ওপর। সব তরলের ক্ষেত্রে একই তাপমাত্রায় এই ঘটনা ঘটে না। পানির ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানি ও তামার পাত্র ব্যবহার করলে প্রায় ২৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এই প্রভাব দেখা যেতে পারে, আবার গ্লিসারল বা অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় এটি শুরু হয়।
শুধু পানি নয়, বিভিন্ন তরল পদার্থেও এই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এমনকি তরল নাইট্রোজেনের মতো অত্যন্ত ঠান্ডা পদার্থ সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রায় পড়লেও একই ধরনের আচরণ দেখা যায়, কারণ তার স্ফুটনাঙ্ক অনেক কম। গবেষকেরা গত দুই দশক ধরে এই প্রভাবের নির্ভরযোগ্য তাত্ত্বিক মডেল তৈরির চেষ্টা করছেন। তরলের প্রকৃতি, পাত্রের গঠন ও উপাদান বদলে বিভিন্ন ধরনের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
লিডেনফ্রস্ট প্রভাবের ব্যবহারিক গুরুত্বও বাড়ছে। এই ধারণা কাজে লাগিয়ে বিশেষ ধরনের থার্মোস্ট্যাট তৈরি করা হয়েছে, যা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে পানির ফোঁটার গতিবিধি ব্যবহার করে সিস্টেমকে ঠান্ডা রাখা হয় এবং তাপমাত্রা কমলে আবার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ভবিষ্যতে উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করা স্মার্ট ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অতিরিক্ত তাপের ক্ষতি কমানো সম্ভব বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।
সিএ/এমআর


