বিজ্ঞানী থিবাস এখনো বিজ্ঞান সমিতির প্রেসিডেন্ট। বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কষ্ট আর হতাশা চাপা দিয়ে তিনি সভা শুরুর নির্দেশ দেন। মূল কম্পিউটার জি জিরো এক্স সভার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাঠ করতে থাকে—২৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ, সময় ১৯টা ৩২ মিনিট ২৪ দশমিক ৭ সেকেন্ডে ৩৩২তম বিজ্ঞান সমিতির ১৫তম সভা শুরু হয়েছে এবং নতুন একটি গ্রহ আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানী অংচর্মাসকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে।
বাইরের আনুষ্ঠানিকতা চললেও ভেতরে ভেতরে থিবাসের মন ভারী হয়ে ওঠে। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার স্মৃতি, গাছপালা, পাখির কোলাহল, নরম মাটির স্পর্শ—সবই যেন তাঁর মনে হাহাকার তোলে। আধুনিক মানবসভ্যতা কৃত্রিম পরিবেশে টিকে থাকলেও প্রকৃতির প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ নিজেদের মহাজাগতিক সভ্যতা বলে গর্ব করলেও প্রকৃত পৃথিবী আজ মৃত এক আবর্জনার স্তূপ।
হঠাৎ থিবাসের হাসি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাঁর চোখে জল চলে আসে। সভার অন্য বিজ্ঞানীরা এই দৃশ্যকে বিদ্রূপের চোখে দেখেন। মূল কম্পিউটার কণ্ঠ বদলে কড়া সতর্কবার্তা দেয়। বিজ্ঞানী অংচর্মাস প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী পিথামুচ একে অপমান হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই অপমান থিবাসকে অতীতের এক বেদনাদায়ক স্মৃতিতে ফিরিয়ে নেয়। আগের সভায় তাঁর ছেলে বিজ্ঞানী থিরানুকেও একইভাবে অপমান করা হয়েছিল। সেদিন তিনি নীরব ছিলেন। কিন্তু এবার আর চুপ থাকতে পারেননি। গম্ভীর কণ্ঠে তিনি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ঘোষণা করেন যে প্রকৃত আবিষ্কারক বিজ্ঞানী অংচর্মাস নন, বরং তাঁর ছেলে থিরানু।
এরপর শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অংচর্মাস তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের আবেগপ্রবণ বলে কটাক্ষ করেন। তৃতীয় বিশ্ব বলতে বোঝানো হয় পুরোনো পৃথিবীকে, যেখানে থিবাসের শিকড়। থিরানু প্রায়ই বাবাকে বলত, তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতেই প্রকৃত পৃথিবীর স্বপ্ন বেঁচে আছে—হলুদ শর্ষে ফুল, খোলা মাঠ, নির্মল বাতাস।
থিরানুর গবেষণার মূল বিষয় ছিল সূর্যের সম্ভাব্য জোড়া নক্ষত্র ‘শিব’ এবং তার কক্ষপথে থাকা একটি গ্রহ। থিরানু দাবি করেছিল, ওই গ্রহটি দেখতে অনেকটা প্রাচীন পৃথিবীর মতো এবং সেখানে আবার শর্ষে ফুল ফুটতে পারে। বিজ্ঞান সমিতিতে এ কথা বলতেই অন্য বিজ্ঞানীরা সন্দেহ ও বিদ্রূপে ভরে ওঠেন।
সভা শেষে থিবাস দেখেন, শহরের ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণযন্ত্রে তাঁর পদত্যাগের খবর প্রচারিত হচ্ছে। বাড়ি ফিরে তিনি ছেলের কোনো খোঁজ পান না। হোম কম্পিউটার জানায়, থিরানু বাইরে গেছে। পরে মূল ল্যাব থেকে বার্তা আসে—থিরানু ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ছেড়ে চলে গেছে। বার্তায় লেখা ছিল, বাবা, বসুন্ধরায় তোমার অপেক্ষায় থাকব আমি।
থিবাস বুঝতে পারেন, থিরানু নতুন গ্রহ বসুন্ধরার উদ্দেশেই পাড়ি জমিয়েছে। চোখভর্তি পানি নিয়ে তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দেন—থার্ড ওয়ার্ল্ডে, অর্থাৎ নতুন বসুন্ধরায়, একদিন আবার বাবাছেলের দেখা হবে।
সিএ/এমআর


