ব্রিটেনজুড়ে গত দুই দশকে গড়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অসংখ্য মসজিদ। মিনারে মিনারে আলো ঝলমল করলেও ভেতরে তৈরি হয়েছে এক নীরব সংকট—যোগ্য ও আধুনিক চিন্তাসম্পন্ন ইমামের অভাব। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা ও সমীক্ষায় এই সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়লেও অনেক মসজিদে ইমামদের বার্ষিক বেতন মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার পাউন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যা দিয়ে পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম পারিশ্রমিক পান ইমামরা। ফলে মেধাবী তরুণেরা ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও এই পেশায় আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
ব্রিটেনের অধিকাংশ মসজিদের পরিচালনা কমিটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী প্রবীণরা। তাঁদের অনেকেই সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অনাগ্রহী। কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক জায়গায় ইমামদের কেবল নামাজ পরিচালনাকারী হিসেবে দেখা হয়, তাঁদের পেশাদার স্বাধীনতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকে। এতে ট্রাস্টি ও ইমামদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে এবং অনেকে মাঝপথে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ব্যবধানও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা তরুণ মুসলমানদের প্রধান ভাষা ইংরেজি এবং তাঁদের জীবনধারা আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু অনেক মসজিদে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত ইমামদের ইংরেজি দক্ষতা ও স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা সীমিত হওয়ায় খুতবা তরুণদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এতে প্রজন্মগত দূরত্ব আরও বাড়ছে।
একজন ইমামের দায়িত্ব কেবল নামাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁকে শিক্ষকতা, পারিবারিক পরামর্শ, সামাজিক সমাধান ও কমিউনিটি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে হয়। অতিরিক্ত কাজের চাপ, পর্যাপ্ত ছুটি ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব অনেককে মানসিক চাপে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তরুণ প্রজন্ম ধর্মীয় দিকনির্দেশনার জন্য অনির্ভরযোগ্য অনলাইন উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারে।
সমাধানের জন্য সমাজকর্মীরা সম্মানজনক বেতন কাঠামো, পেশাদার প্রশিক্ষণ, তরুণ ও নারীদের পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি এবং মসজিদকে কমিউনিটি হাব হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, কেবল স্থাপত্য নয়, যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া মসজিদের প্রকৃত ভূমিকা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সিএ/এমআর


