আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিহার্য একটি যন্ত্র স্টেথোস্কোপের জন্মকাহিনি আজও বিস্ময় জাগায়। ১৮১৬ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ফ্রান্সের প্যারিসের নেকার হাসপাতালে কর্মরত তরুণ চিকিৎসক রেনে লেনেক এক হৃদ্রোগে আক্রান্ত নারী রোগী পরীক্ষা করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। সে সময় রোগীর হৃদস্পন্দন শোনার একমাত্র উপায় ছিল সরাসরি বুকে কান লাগানো, যাকে বলা হতো ডিরেক্ট অসকাল্টেশন। ব্যক্তিগত লজ্জাবোধের কারণে লেনেক বিকল্প কোনো পদ্ধতির কথা ভাবতে শুরু করেন।
১৮১৯ সালে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লেনেক লেখেন, কাঠের এক প্রান্তে কান লাগালে অন্য প্রান্তের সূক্ষ্ম শব্দও স্পষ্টভাবে শোনা যায়—এই সহজ শব্দতত্ত্বের ধারণাই তাঁকে নতুন চিন্তার পথে এগিয়ে নেয়। তিনি একটি কাগজ গুটিয়ে সিলিন্ডারের মতো তৈরি করেন এবং এক প্রান্ত রোগীর বুকে, অন্য প্রান্ত নিজের কানে লাগান। এতে হৃদ্যন্ত্রের শব্দ আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে শোনা যায়।
পরবর্তীতে কাগজের বদলে তিনি কাঠের একটি সিলিন্ডার তৈরি করেন, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস ২.৫ সেন্টিমিটার। এই যন্ত্রের নাম দেওয়া হয় স্টেথোস্কোপ। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় স্টেথোস অর্থ বুক এবং স্কোপিন অর্থ দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা। অল্প সময়ের মধ্যেই লেনেকের চিকিৎসাব্যাগে স্টেথোস্কোপ একটি অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়। হৃদ্যন্ত্রের পাশাপাশি ফুসফুসের শব্দ শোনার ক্ষেত্রেও তিনি এই যন্ত্র ব্যবহার শুরু করেন।
লেনেক সংগীতের প্রতিও আগ্রহী ছিলেন এবং বাঁশি খোদাই করার দক্ষতা থেকেই এমন সূক্ষ্ম যন্ত্র নির্মাণের ধারণা পান। বুকের বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে স্টেথোস্কোপ ব্যবহারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৮২২ সালে তিনি কলেজ ডি ফ্রান্সে প্রভাষক এবং ১৮২৩ সালে মেডিসিনের অধ্যাপক হন। তবে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে তাঁর মৃত্যু হয়।
শুরুর দিকে অনেক চিকিৎসক এই যন্ত্র ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, কেবল কানে শোনা পরীক্ষাই যথেষ্ট। কিন্তু ১৮২০-এর দশকেই স্টেথোস্কোপ ইউরোপজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নকশায় পরিবর্তন আসে, যুক্ত হয় রাবার ও পরে প্লাস্টিকের নমনীয় টিউবিং। বাইনোরাল ইয়ারপিস যুক্ত হওয়ায় শব্দ শোনার মান আরও উন্নত হয়। বর্তমানে স্টেথোস্কোপ বুকের ভেতরের শব্দ অ্যাকুয়াস্টিক তরঙ্গের মাধ্যমে কানে পৌঁছে দিয়ে চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সিএ/এমআর


