দশ মাস আগে লালমনিরহাটের আদিতমারীর সাধারণ মেয়ে সুলতানা পারভীনের জীবনে এসেছে নতুন আশার আলো। তিনি বিয়ে করেছিলেন জাপান প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে। স্বপ্ন ছিল প্রিয় স্বামীর সঙ্গে দেখা ও নতুন দেশে সুখী সংসার গড়া। কিন্তু হঠাৎই প্রযুক্তির অজানা অপব্যবহারের শিকার হয়ে তার স্বপ্ন ভেঙে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি একটি ভুয়া ভিডিও মুহূর্তেই তার জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে তোলে।
পরিবার ও সমাজের সমালোচনা, অবিশ্বাস এবং মানহানির ভয় সুলতানার চারপাশে অন্ধকারের মতো ঘিরে ধরে। বহু চেষ্টা সত্ত্বেও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেননি তিনি। গত বছরের ৬ এপ্রিল বাবার বাড়িতে আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবন শেষ করেন সুলতানা, জীবনের সকল কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে।
উল্লেখযোগ্য, একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে সুলতানার স্বামী অনিকের পর্তুগাল প্রবাসী বোন জামাই মৃদুল ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। প্রথমে সুলতানাকে, পরে অনিককে পাঠানো এই ভিডিওটির প্রভাব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ভিডিওটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নীলা (ছদ্মনাম) এক সকালে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ পান—‘তোমার ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেছে!’ লিংকে ক্লিক করলে দেখা যায়, ভিডিওটি মূলত পর্নোগ্রাফিক, যেখানে তার মুখ অন্য নারীর দেহের সঙ্গে যুক্ত।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ভুয়া ভিডিও, বিশেষত ‘ডিপফেক’ ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে অহরহ। এসব ভিডিওতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়, ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না এগুলো ফেক।
গবেষণা অনুযায়ী, ৯০ শতাংশ অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ করা হয় না। আইনি সহায়তার অভাবে ২৫ শতাংশ, হয়রানির ভয়ে ২৩ শতাংশ এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়ে ১৭ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না।
ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেকে প্রতিশোধ, সাবেক প্রেমিক সম্পর্ক ভাঙা বা সাইবার চাঁদাবাজির জন্য ভিডিও তৈরি করে। অপরাধীরা ভিপিএন ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখে, ফলে শনাক্ত করা জটিল হয়ে যায়।
পুলিশ সদরদপ্তর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ৯ হাজার ১১৭টি হয়রানির অভিযোগ পেয়েছে। এসময় আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারী অ্যাক্টিভিস্টদের অন্তত আটজনকে জড়িয়ে ৩২টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে ডিপফেক ভিডিও তৈরি করতে বিশাল কম্পিউটার প্রয়োজন ছিল, এখন সাধারণ মোবাইল অ্যাপ দিয়েই একজনও এটি করতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে।
আইন অনুযায়ী, মোবাইলে অশ্লীল, আপত্তিকর বা অশোভন বার্তা পাঠালে দুই বছরের কারাদণ্ড বা দেড় কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রেস উইং সামাজিক মিডিয়া ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি জুয়াড়িদের তৈরি এআই জেনারেটেড ডিপফেক ভিডিও থেকে প্রতারিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানি ঘটানো হচ্ছে।
সিএ/এমআর


