রাজধানীর মিরপুরের কালশী এলাকায় একটি পুরোনো মোবাইল দোকানের সামনে সাঁটানো কাগজে লেখা ছিল, দোকানটি ভাড়া হবে। বিষয়টি নজরে আসার পর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে বিক্রি না থাকায় বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিক। এমন চিত্র শুধু একটি দোকানে নয়, আশপাশের একাধিক মার্কেটেও দেখা যাচ্ছে।
মিরপুর ১ নম্বরের সালেহউদ্দিন ভবনসহ আশপাশের বিভিন্ন মোবাইল মার্কেটে ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। বিক্রেতারা জানান, নির্বাচন ঘিরে বিক্রি বাড়ার যে আশা ছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন হয়নি। বরং বছরের শেষ দিকে অন্যান্য সময়ের তুলনায় বিক্রি আরও কমে গেছে। অনেক দোকানে দিনের পর দিন উল্লেখযোগ্য বিক্রি না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশের একটি পরিচিত চেইন মোবাইল শপ রাজধানীতে তাদের ছয়টি শোরুম বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান বিক্রি দিয়ে শোরুম পরিচালনার খরচ ওঠানো যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভালো হলে আবার নতুন করে শোরুম চালুর চিন্তা করা হবে।
করোনার আগে দেশে বছরে মোবাইল উৎপাদন ও আমদানির সংখ্যা ছিল চার কোটির বেশি, আর বিক্রি হতো সাড়ে তিন কোটি বা তার কাছাকাছি। তবে তিন বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে বছরে প্রায় দুই কোটি মোবাইল ফোন বিক্রি কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে মোবাইল উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার ইউনিট। একই সময়ে টুজি, ফোরজি ও ফাইভজি মিলিয়ে আমদানি হয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার ৬৭৪টি সেট। নভেম্বর মাসে কোনো মোবাইল ফোন আমদানি হয়নি বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। কোনো কোনো মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র পাঁচটি সেট, আবার কোথাও ৪০ বা ৯৫টি সেটের মতো খুব কম সংখ্যাও দেখা গেছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে মোট মোবাইল ফোনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৭৪টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বর মাসের হিসাব যুক্ত হলেও সামগ্রিক চিত্রে খুব বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। গত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি বছরের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
মোবাইল উৎপাদক ও আমদানিকারকদের মতে, আগে দেশে বছরে গড়ে চার কোটির বেশি মোবাইল বিক্রি হতো। দুই বছর আগেও তিন কোটির বেশি সেট বিক্রি হয়েছে। কিন্তু গত বছর থেকে এই খাতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। করোনার পর থেকেই বাজারে মন্দা শুরু হয়, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে মোবাইল উৎপাদন ছিল ২১ লাখ ৬৭ হাজার ইউনিট, অক্টোবরে ২৩ লাখ ৫২ হাজার এবং নভেম্বরে ২৪ লাখ ৩২ হাজার ইউনিট। অর্থাৎ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে বিক্রির তুলনায় তা এখনও কম।
এ বিষয়ে দেশের মোবাইল ফোন আমদানিকারকদের সংগঠন বিএমপিআইএ’র যুগ্ম সম্পাদক রিজওয়ানুল হক বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী। তার ভাষায়, দেশের বাজারে মোবাইল উৎপাদন ও বিক্রি আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, ডলারের দাম বৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের মূল্য বৃদ্ধি— এসব কারণ একসঙ্গে মোবাইল বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাজার কবে ঘুরে দাঁড়াবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি।
পূর্ববর্তী বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজারে আসে সাড়ে চার কোটি মোবাইল সেট, যার মধ্যে এক কোটি আমদানি করা এবং বাকিগুলো দেশে উৎপাদিত। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট বাজারে আসে ৪ কোটি ১০ লাখ ফোন, এর মধ্যে আমদানি ছিল দেড় কোটি এবং দেশে উৎপাদিত ছিল ২ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ২ কোটি ৯৪ লাখ মোবাইল ফোনের মধ্যে আমদানি ছিল ১ কোটি ৪৯ লাখ এবং দেশে উৎপাদিত ছিল ১ কোটি ৪৫ লাখ সেট।
সিএ/এমআর


