কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ইতিহাসের যেকোনো আবিষ্কারের চেয়ে দ্রুতগতিতে বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে। বিদ্যুতের চেয়েও দ্রুত, ইন্টারনেটের চেয়েও দ্রুত এবং অতীতের সব শিল্পবিপ্লবের চেয়েও দ্রুত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী সৃষ্টিগুলোর একটি হিসেবে এআই একদিকে হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক, আবার অন্যদিকে হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর বিপদের কারণ।
অনেক বছর আগে নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় “বিজ্ঞানের সুবিধা ও অসুবিধা” বিষয়ক একটি কুইজে ১০০-এর মধ্যে ৯২ নম্বর পাওয়ার অভিজ্ঞতা আজও মনে পড়ে। তখন এক সহপাঠী জানতে চেয়েছিল, লেখার ভাবনা কোথা থেকে এসেছে। উত্তরে বলা হয়েছিল, একটি বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী উপন্যাস থেকেই সেই চিন্তার জন্ম। গল্পটিতে ছিল এক অত্যন্ত উন্নত রোবট, যেটি যেকোনো মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের আদেশ মানা বন্ধ করে দেয়। সেখান থেকেই ধ্বংসের সূচনা হয়।
এক সময় এই কাহিনীকে রোমাঞ্চকর কিন্তু অতিরঞ্জিত মনে হলেও, বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধারণা আর ততটা নিশ্চিত নয়। যা একসময় কেবল কল্পবিজ্ঞান ছিল, আজ তা বাস্তবের খুব কাছাকাছি। এআই আমাদের অসাধারণ ক্ষমতা দিতে পারে, আবার অসতর্ক ব্যবহারে আমাদের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে।
ইতিবাচক দিকটি আগে দেখা যাক। এআই ইতিমধ্যেই এমন সব কাজ করছে, যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হতো। স্বাস্থ্যখাতে এটি ক্যান্সার শনাক্ত ও চিকিৎসায় এমন নির্ভুলতা দেখাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শিল্পকারখানায়, যন্ত্র বিকলের আগেই ত্রুটি শনাক্ত করে খরচ কমাচ্ছে এবং বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করছে।
২০২৪ সালে বিজ্ঞানীরা এআই-এর সহায়তায় ডায়াবেটিসের একটি সম্ভাব্য নতুন চিকিৎসার কথা জানান, যা এআই ছাড়া হলে প্রায় ৪০ বছর সময় লাগত। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সমাধানেও এআই ভূমিকা রাখছে, যা নোবেল পুরস্কার জয়ের পথ প্রশস্ত করছে। এসব উদাহরণ দেখায়, এআই মানুষের দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি একঘেঁয়ে কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্তে সহায়তা করে।
তবে ইতিহাসের একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে। প্রায় ৮০ বছর আগে ম্যানহাটন প্রজেক্টে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীরা একসঙ্গে কাজ করে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিলেন। বিজ্ঞানের সেই অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত হিরোশিমার ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়, যেখানে মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শিক্ষা ছিল স্পষ্ট—শক্তিশালী প্রযুক্তি যদি সাবধানে পরিচালিত না হয়, তবে তা ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
ম্যানহাটন প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন সীমিতসংখ্যক বিজ্ঞানী। আর এআই মানে হলো লক্ষ লক্ষ মেধাবী মন একসঙ্গে, বিরতিহীনভাবে কাজ করা—ঘুমহীন ও অনুভূতিহীন। এতে বোঝা যায়, আজ মানবজাতির হাতে কত বিশাল ক্ষমতা এসে পৌঁছেছে।
এআই নিজে ভালো বা মন্দ নয়। এটি কেবল একটি হাতিয়ার। আগুন যেমন খাবার রান্না করতে পারে, তেমনি অসাবধানতায় ঘরও পুড়িয়ে দিতে পারে। এআইও তেমনই। এটি এসেছে টিকে থাকার জন্য এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও বাড়বে।
এআই আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্র হবে, নাকি সবচেয়ে বিপজ্জনক সৃষ্টি—তা নির্ভর করছে আজ আমরা কী সিদ্ধান্ত নিই তার ওপর। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করলে, এআই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বন্ধু। আর অসতর্কভাবে ব্যবহার করলে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে আমাদের সবচেয়ে অচিন্ত্যনীয় শত্রু।
সিএ/এএ


