আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এক মহিমান্বিত রজনী মানব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। পৃথিবী যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন, তখন আসমান সাজছিল তার রবের সবচেয়ে প্রিয় মেহমানকে অভ্যর্থনা জানাতে। মেরাজের এই সফর ছিল শুধু ভৌত ভ্রমণ নয়; বরং কষ্টে জর্জরিত এক নবীর হৃদয়ের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সান্ত্বনা ও সম্মাননা।
সেই সময় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে নেমে এসেছিল গভীর বেদনা। কুরাইশদের নির্যাতন, প্রিয় চাচা আবু তালিবের ইন্তেকাল এবং উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা রা.-এর ওফাত—সবকিছু মিলিয়ে সেই বছর ইতিহাসে ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখের বছর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তখন নবীজির বয়স ছিল ৫১ বছর। এই দুঃসময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন মেরাজের অলৌকিক সফরের মাধ্যমে।
এক নিঝুম রাতে এশার নামাজের পর কাবাসংলগ্ন হাতিমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নবীজি। সে সময় জিবরাইল আ. আগমন করেন। নবীজিকে নিয়ে যাওয়া হয় জমজম কূপের কাছে। সেখানে তাঁর বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ করে হৃদপিণ্ড বের করে জমজমের পবিত্র পানিতে ধৌত করা হয়। এরপর ঈমান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পেয়ালা তাঁর বুকে ঢেলে পুনরায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেন ঊর্ধ্বাকাশের সেই মহান সফরের ভার বহনে তিনি প্রস্তুত হন।
এরপর উপস্থিত করা হয় দ্রুতগতির সওয়ারি বুরাক। নবীজি বুরাকে আরোহণ করে মুহূর্তের মধ্যেই মক্কা থেকে বায়তুল মাকদিসে পৌঁছে যান। সেখানে সব নবী-রসুল একত্রিত ছিলেন। নবীজি দুই রাকাত নামাজে তাঁদের ইমামতি করেন এবং নবীদের নেতা হিসেবে সম্মান লাভ করেন। এরপর জিবরাইল আ. দুধ ও শরাবের দুটি পাত্র পেশ করলে নবীজি দুধের পাত্র গ্রহণ করেন। তখন জিবরাইল আ. বলেন, “আপনি স্বভাবজাত ফিতরাতকেই বেছে নিয়েছেন; অন্যথায় আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হতো”।
এরপর শুরু হয় আসমানসমূহে ভ্রমণ। প্রথম আসমানে নবীজি সাক্ষাৎ করেন মানবজাতির পিতা হজরত আদম আ.-এর সঙ্গে। দ্বিতীয় আসমানে সাক্ষাৎ হয় হজরত ঈসা আ. ও হজরত ইয়াহইয়া আ.-এর সঙ্গে। তৃতীয় আসমানে দেখা মেলে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী হজরত ইউসুফ আ.-এর। চতুর্থ আসমানে সাক্ষাৎ হয় হজরত ইদরিস আ.-এর সঙ্গে। পঞ্চম আসমানে ছিলেন হজরত হারুন আ.। ষষ্ঠ আসমানে নবীজি সাক্ষাৎ পান হজরত মুসা আ.-এর। আর সপ্তম আসমানে তিনি হজরত ইবরাহিম আ.-কে দেখতে পান, যিনি বায়তুল মামুরে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। প্রতিটি আসমানেই নবীজিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং তাঁর মর্যাদা আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সিএ/এসএ


