মানুষের জীবনের দীর্ঘতম যাত্রার শুরু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বা কর্মস্থলের ডেস্ক থেকে নয়, শুরু হয় একজন মায়ের কোল থেকে। সেই কোলই মানুষের প্রথম পাঠশালা, প্রথম মাদরাসা এবং প্রথম চরিত্র গঠনের কারখানা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—যাঁরা সাফল্য ও আলোকিত চরিত্র নিয়ে পৃথিবীতে স্মরণীয় হয়েছেন, তাঁদের পেছনে রয়েছে একজন নীরব সাধিকার অবিরাম দোয়া, ত্যাগ ও আদর্শ। সেই নীরব সাধিকার নাম—মা।
বর্তমান সমাজে সন্তান প্রতিপালনকে অনেক সময় খাবার, পোশাক, স্কুল কিংবা কোচিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। অথচ ইসলাম সন্তান গঠনের ক্ষেত্রে যে মৌলিক শক্তির কথা বলে, তা কেবল বস্তুগত নয়। মায়ের দোয়া ও আদর্শিক উপস্থিতিই সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই দুই শক্তি মিলেই এমন এক অদৃশ্য কাঠামো গড়ে তোলে, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি মানুষ সারা জীবন পথচলা করে।
ইসলামে দোয়ার মর্যাদা ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। কিছু দোয়া রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয় : (১) মজলুমের দোয়া, (২) মুসাফিরের দোয়া, (৩) সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৬)। এই হাদিসে মা-বাবা উভয়ের কথা বলা হলেও ইসলামী স্কলারদের সর্বসম্মত মত হলো—মায়ের দোয়ার প্রভাব আরও গভীর। কারণ সন্তান জন্ম, লালন-পালন ও মানসিক গঠনে মায়ের ভূমিকা অধিক প্রত্যক্ষ ও দীর্ঘস্থায়ী।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সন্তানের অন্তর যে পথে বাঁক নেয়, তা মূলত নির্ভর করে তার ঘরে উচ্চারিত দোয়া ও কথার ওপর।’ (তুহফাতুল মাওদূদ)। একজন মা যখন রাতের শেষ প্রহরে অশ্রুসজল চোখে সন্তানের জন্য হেদায়েত, ঈমান ও নিরাপত্তা কামনা করেন, সেই দোয়া হয়তো মানুষের কানে পৌঁছায় না, কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ চরিত্রে তার গভীর ও স্থায়ী প্রভাব পড়ে।
পবিত্র কোরআনেও মা-বাবার দোয়ার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ—‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সালাত কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমার বংশধরদেরও।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪০)। আলেমদের মতে, এক প্রজন্মের দোয়া কখনো কখনো পরবর্তী একাধিক প্রজন্মে ফল দেয়। ইসমাঈল (আ.), ইসহাক (আ.) ও পরবর্তী নবীদের জীবনে এই দোয়ার ধারাবাহিকতার প্রভাব স্পষ্ট।
দোয়ার পাশাপাশি মায়ের আদর্শিক জীবনযাপনও সন্তানের জন্য শক্তিশালী শিক্ষা। শিশু প্রথমে শোনে না, দেখে। সে মায়ের নামাজ, কথা বলার ভঙ্গি, ধৈর্য, রাগ নিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর ওপর ভরসা করা প্রত্যক্ষ করে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘শিশুর অন্তর কাঁচা মাটির মতো, যা প্রথমে তাতে আঁকা হয়, সেটাই স্থায়ী হয়ে যায়।’ (তুহফাতুল মাওদূদ)। একজন মা যদি সত্যবাদিতা, লজ্জাশীলতা, ধৈর্য ও আল্লাহভীতিকে নিজের জীবনে ধারণ করেন, তবে সন্তানকে আলাদা করে শেখাতে হয় না—আদর্শ নিজেই শিক্ষা হয়ে ওঠে।
ইতিহাসে এর বহু বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মা দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁকে ইলমের পথে অবিচল রেখেছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর দৃষ্টিশক্তি তাঁর মায়ের দোয়ার বরকতেই ফিরে এসেছিল—এগুলো কোনো রূপক নয়, বরং প্রামাণ্য ইতিহাস।
আজকের মা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ডিজিটাল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয় ও সময়ের স্বল্পতার ভেতর দিয়েই তাঁকে সন্তান গড়ে তুলতে হচ্ছে। তবে ইসলাম এখানে মাকে অসহায় রাখেনি। বরং প্রতিটি ধৈর্য, প্রতিটি নীরব কষ্টকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে আল্লাহর পথেই আছে। আর যদি সে তার বৃদ্ধ মাতা-পিতার জন্য পরিশ্রম করে, তবে সেও আল্লাহর পথেই আছে।’ (সিলসিলা সহিহা : ২/৫৩৮)।
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে তাই মায়ের দোয়া ও আদর্শকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সব স্তরে মাকে সম্মান, সময় ও মানসিক নিরাপত্তা দেওয়া জরুরি। কারণ একজন আলোকিত মা মানেই একটি আলোকিত প্রজন্ম। একজন মা হয়তো আলোচনার মঞ্চে নেই, ইতিহাসের শিরোনামেও নেই; কিন্তু তাঁর সিজদার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জাতির ভবিষ্যৎ। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে অনেকটাই সেই নিঃশব্দ দোয়াগুলোতে, যা মানুষ শোনে না, শুধু আল্লাহ শোনেন।
সিএ/জেএইচ


