রমজানের শেষ দশ দিন সাধারণত ফিলিস্তিনিদের পদচারণায় মুখর থাকে আল-আকসা মসজিদ। ইতিকাফ ও ইবাদতের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার মুসল্লি সেখানে সমবেত হন। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দশ দিনে আল-আকসা মসজিদ এবং জেরুজালেমের পুরনো শহরকে প্রায় সম্পূর্ণ মুসল্লিশূন্য করে রাখা হয়েছে।
মসজিদের করিডোরে নেই কোনো কোলাহল বা ইবাদতকারীদের ভিড়। যে আঙিনা ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য থাকার কথা, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে আল-আকসাকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে আল-আকসা মসজিদে ইমামতি করে আসা এক প্রবীণ ইমাম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আল-আকসা আজ বড় একা। গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ইতিকাফ করত, সেখানে এখন বড়জোর চার-পাঁচজন মানুষ নিয়ে আমাদের নামাজ পড়তে হচ্ছে। শুধু ভেতরের স্পিকারে আজান ও নামাজ হয় বলে বাইরের মানুষ কিছু শুনতেও পান না।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি নিজের বাসার পাশের একটি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ান। সেখানে মুসল্লিরা যখন তাকে দেখে বলেন যে আজ আল-আকসার কণ্ঠ আমাদের মাঝে এসেছে, তখন তার বুক ভেঙে কান্না আসে। সবাই তাকে একটাই প্রশ্ন করেন, আল-আকসা কবে খুলবে।
পেশায় দন্তচিকিৎসক হলেও গত ১৫ বছর ধরে শখের বসে আল-আকসায় স্বেচ্ছায় আজান ও কোরআন তিলাওয়াত করে আসছেন মাজদ আল-হাদমি। তিনি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, নিরাপত্তার অজুহাতে মসজিদটি বন্ধ রাখা হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
জেরুজালেম গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচবার আল-আকসায় জুমার নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অবরোধকে সবচেয়ে দীর্ঘ ও কঠোর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গভর্নরেটের মিডিয়া ডিরেক্টর ওমর রাজুব জানান, সাম্প্রতিক সময়ে আল-আকসাকে ঘিরে কড়াকড়ি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পূর্ণাঙ্গ অবরুদ্ধ অবস্থা, মুসল্লিদের ইবাদতে বাধা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে বাধা এবং মসজিদের আঙিনায় সশস্ত্র টহল জোরদারসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ওয়াকফ কমিটির প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত করা, মুসল্লিদের প্রবেশে বাধা দেওয়া, গণগ্রেপ্তার এবং অনেকের ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাও ঘটেছে। গভর্নরেট কর্তৃপক্ষের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আল-আকসার ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আল-আকসা ঘিরে এই নীরবতা কেবল নিরাপত্তাজনিত বিষয় নয়, বরং শহরের ধর্মীয় ও জনতাত্ত্বিক পরিচয় পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
সিএ/এমআর


