মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষের কাছে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দিতে উপমার আশ্রয় নিতেন। প্রাণী ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আচরণ, বিশ্বাস ও চরিত্রের তুলনা করে তিনি জটিল বিষয়কে সহজ ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলতেন। এসব উপমা থেকে স্পষ্ট হয়, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও আন্তরিক। প্রাণ ও পরিবেশ তাঁর দাওয়াতি কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে।
নবীজি (সা.) নানাবিধ বিষয় বোঝাতে প্রাণী ও প্রকৃতির উদাহরণ ব্যবহার করতেন। এর মাধ্যমে তিনি কেবল একজন প্রজ্ঞাবান শিক্ষকই নন, বরং প্রকৃতির সূক্ষ্ম দিকগুলো অনুধাবনকারী একজন মহান পথপ্রদর্শক হিসেবেও পরিচিত হন।
একবার এক আরব বেদুইন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে সাহায্য চাইতে আসে। সম্ভবত রক্তপণের অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সে এসেছিল। রাসুল (সা.) তাকে কিছু দান করে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি তার সঙ্গে ভালো আচরণ করেছেন কি না। বেদুইনটি অকৃতজ্ঞভাবে জানায়, তিনি ভালো আচরণ করেননি। এতে সাহাবিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলেও রাসুল (সা.) তাঁদের শান্ত থাকতে বলেন। পরে বেদুইনকে ঘরে ডেকে নিয়ে আরও সাহায্য করেন এবং আবার প্রশ্ন করলে বেদুইন সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
পরদিন সাহাবিদের সামনে বিষয়টি মীমাংসা হওয়ার পর রাসুল (সা.) একটি উপমা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর এবং ওই বেদুইনের ঘটনা এমন একজন ব্যক্তির মতো, যার একটি উট পালিয়ে গেলে লোকজন তাড়া করে আরও ভয় পাইয়ে দেয়। কিন্তু উটের মালিক শান্তভাবে ঘাস দেখিয়ে উটকে ফিরিয়ে আনে। ঠিক তেমনি, ধৈর্য ও দয়ার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব। এই উপমার মাধ্যমে তিনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে কোমলতা ও প্রজ্ঞার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আরেক হাদিসে নবীজি (সা.) আনুগত্যের বিষয়ে বলেন, একজন মুমিন নাকে লাগাম দেওয়া উটের মতো—যেদিকে টানা হয়, সেদিকেই সে যায়। এর মাধ্যমে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
ভালো মানুষের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এক শ উটের পালের মধ্যেও হয়তো একটি উট পাওয়া যায় না, যা আরোহনের উপযোগী। অর্থাৎ সমাজে প্রকৃত মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ সব সময়ই অল্পসংখ্যক। আমানতদার মানুষের অভাব একসময় সমাজে গভীর সংকট তৈরি করতে পারে—এ কথাও তিনি ইঙ্গিত করেছেন।
মৌমাছি ও স্বর্ণের উপমায় নবীজি (সা.) মুমিনের চরিত্র ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মুমিন স্বর্ণের মতো—আগুনে পোড়ালেও তার মান নষ্ট হয় না। আবার মুমিন মৌমাছির মতো, যে পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করে এবং পবিত্র ফলই দেয়; সে কোথাও বসে ক্ষতি করে না। এসব উপমার মাধ্যমে তিনি চরিত্রের পবিত্রতা ও সহনশীলতার শিক্ষা দেন।
শস্যক্ষেত্রের কোমল চারা ও শক্ত দেবদারু গাছের উপমায় তিনি মুমিন ও মোনাফিকের পার্থক্য তুলে ধরেন। মুমিন বাতাসে নুয়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু মোনাফিক কঠোর গাছের মতো, যা শেষ পর্যন্ত উপড়ে পড়ে। অর্থাৎ মুমিন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে জানে, আর মোনাফিক একগুঁয়েমির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও এক উপমায় তিনি বলেন, ইসলাম অত্যন্ত মজবুত একটি দীন, তাই এতে প্রবেশ করতে হবে কোমলতার সঙ্গে। অতিরিক্ত কঠোরতা মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে এবং পথে চলা কঠিন করে দেয়। পরিমিতিবোধ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
গর্ত ও সাপের উপমায় নবীজি (সা.) সতর্কতার শিক্ষা দেন। তিনি বলেন, একজন মুমিন একই গর্ত থেকে দুইবার দংশিত হয় না। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
এসব উপমার মাধ্যমে নবীজি (সা.) মানুষের চিন্তা ও আচরণে ভারসাম্য, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার পথ দেখিয়েছেন। তাঁর দাওয়াতি পদ্ধতিতে প্রাণ ও প্রকৃতি শুধু উদাহরণ নয়, বরং জীবনবোধ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
সিএ/এমআর


