মানুষ সাধারণত বিজয় ও সাফল্যকে শক্তি, ক্ষমতা, সম্পদ এবং সংখ্যার বিচারে মূল্যায়ন করে। ইতিহাসের বহু অধ্যায়েও দেখা যায়, অস্ত্র ও প্রভাব যাদের হাতে বেশি ছিল, বিজয় যেন তাদেরই ভাগ্যে জুটেছে। তবে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এই প্রচলিত ধারণার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়। ইসলাম মনে করে, আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার মাপকাঠি শক্তি বা সংখ্যা নয়, বরং বিনয়, অসহায়ত্ব ও হৃদয়ের গভীর আকুতি।
ইসলামের এই দর্শন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিসে মুস‘আব ইবনু সা‘দ (রা.) বলেন, সা‘দ (রা.) একসময় মনে করেছিলেন, অন্যদের তুলনায় তাঁর মর্যাদা বেশি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা তো দুর্বলদের দোয়ার মাধ্যমেই সাহায্য ও রিজিক প্রাপ্ত হচ্ছ। এই বক্তব্য শুধু উপদেশ নয়; বরং সমাজ ও ক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।
সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী, বহু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং দোয়া কবুলের জন্য প্রসিদ্ধ সাহাবি। এমন একজন সাহাবির মাঝেও যদি সাময়িক আত্মতৃপ্তি আসে, সেটি মানবীয়। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন—ব্যক্তিগত মর্যাদা আল্লাহর সাহায্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং উম্মাহর বিজয় ও কল্যাণের পেছনে থাকে সেই মানুষগুলোর দোয়া, যাদের নাম পরিচিত নয়, যাদের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই, কিন্তু যাদের অন্তর আল্লাহর কাছে ভাঙা কণ্ঠে নিবেদিত।
হাদিসে উল্লেখিত দুর্বল শব্দটি কেবল শারীরিক দুর্বলতাকে বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে দরিদ্র মানুষ, অসুস্থ ও মজলুম, এতিম ও বিধবা, সামাজিকভাবে অবহেলিত ব্যক্তি এবং সেইসব মুমিন, যাদের আমল গোপন হলেও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, এসব মানুষের অন্তর অহংকারমুক্ত হওয়ায় তাদের দোয়া অধিক কবুল হয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালেই দোয়ার এই অদৃশ্য শক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা ছিল সংখ্যায় কম ও অস্ত্রে দুর্বল। কিন্তু তাদের দোয়া ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা বিজয়ের পথ খুলে দেয়। পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, যখন মুমিনরা তাদের রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিল, তখন তিনি তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।
বর্তমান সমাজে উন্নয়ন, সাফল্য ও বিজয়ের হিসাব প্রায়ই অর্থ, পরিকল্পনা ও ক্ষমতার ভিত্তিতে করা হয়। অথচ সমাজের প্রান্তিক মানুষ—মাদরাসার দরিদ্র ছাত্র, গ্রামের ইমাম, নীরব মুমিন নারী—অনেক সময় অবহেলিত থেকে যান। ইসলামের এই শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে সমাজ দুর্বলদের অবহেলা করে, সে সমাজ আল্লাহর সাহায্য থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করে।
ইসলাম শক্তিকে অস্বীকার করেনি, বরং শক্তির অহংকার ভেঙে দিয়েছে। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সেই হৃদয়, যা বিনয়ী; সবচেয়ে কার্যকর সেই দোয়া, যা নিঃশব্দে ওঠে। তাই দুর্বলদের অবহেলা নয়, বরং তাদের সম্মান ও দোয়াকেই ইসলামে বিজয় ও রিজিকের নীরব উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সিএ/এমআর


