শাবান মাস ইসলামী বর্ষপঞ্জির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। যদিও এটি কোনো হারাম মাস নয়, তবু রমজানের প্রস্তুতির জন্য এ মাসকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি রোজা রাখতেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রমজানের আগে আত্মশুদ্ধি, ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া এবং শারীরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে শাবান মাসে সবার জন্য রোজার বিধান একরকম নয়। কারও জন্য তা আবশ্যক, কারও জন্য পছন্দনীয়, আবার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অপছন্দনীয় কিংবা নিষিদ্ধও হতে পারে। ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী শাবান মাসের রোজাকে মূলত চার ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমত, ওয়াজিব বা আবশ্যক রোজা। যাদের আগের রমজানের কাজা রোজা বাকি রয়েছে—যেমন সফর, অসুস্থতা বা নারীদের বিশেষ শারীরিক অবস্থার কারণে রোজা ছুটে গেছে—তাদের জন্য শাবান মাসে সেই রোজাগুলো আদায় করা জরুরি। কারণ পরবর্তী রমজান শুরু হওয়ার আগে কাজা আদায় করা বাধ্যতামূলক। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, তাঁর ওপর রমজানের কাজা রোজা থাকলে তিনি সাধারণত শাবান মাসেই তা আদায় করতেন। এ ছাড়া মান্নতের রোজা কিংবা কাফফারার রোজাও এই সময়ে আদায় করা যায়।
দ্বিতীয়ত, মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় রোজা। শাবান মাসে অধিক হারে নফল রোজা রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে বিবেচিত। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো বেশি রোজা রাখেননি। কখনো কখনো সাহাবিরা ধারণা করতেন, তিনি হয়তো পুরো মাসই রোজা রাখবেন। তবে আলেমদের ব্যাখ্যায় বোঝা যায়, ‘পুরো মাস’ বলতে মূলত মাসের অধিকাংশ সময়কে বোঝানো হয়েছে। এই নফল রোজা মানুষকে রমজানের ইবাদতের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে।
তৃতীয়ত, মাকরুহ বা অপছন্দনীয় রোজা। কিছু আলেমের মতে, শাবান মাসের শেষ ১৫ দিনে নতুনভাবে রোজা শুরু করা অপছন্দনীয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে শাবানের অর্ধেক পার হওয়ার পর রোজা না রাখার নির্দেশ এসেছে। যদিও কয়েকজন মুহাদ্দিস এই হাদিসের সনদ দুর্বল বলেছেন, তবু সতর্কতার জায়গা থেকে অনেক ফকিহ এই সময় নতুনভাবে রোজা শুরু করাকে নিরুৎসাহিত করেন। তবে যারা আগে থেকেই নিয়মিত নফল রোজা রাখতেন, তাদের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য নয়।
চতুর্থত, হারাম বা নিষিদ্ধ রোজা। রমজান শুরু হওয়ার এক বা দুই দিন আগে রমজানকে স্বাগত জানানোর নিয়তে রোজা রাখা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে এ বিষয়ে নিষেধ করেছেন, তবে যাদের নির্দিষ্ট দিনে নিয়মিত রোজা রাখার অভ্যাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। একইভাবে সন্দেহের দিনে—যেদিন চাঁদ দেখা না যাওয়ায় রমজান শুরু হয়েছে কি না তা নিয়ে সংশয় থাকে—রোজা রাখাকে অনেক আলেম হারাম বা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলেছেন।
শাবান মাস মানুষকে শৃঙ্খলা, সংযম ও আত্মপ্রস্তুতির শিক্ষা দেয়। এ মাসে কাজা রোজা দ্রুত আদায় করা, নিয়মিত নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার মাধ্যমে রমজানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।
সিএ/এমআর


