সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে মুসলিম সমাজ কেবল বিজয় কিংবা সাম্রাজ্য বিস্তারের গল্পই নয়, বরং বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্তও উপস্থাপন করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রণীত মদিনা সনদ থেকে শুরু করে পরবর্তী মুসলিম শাসনামলে অমুসলিমদের নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার বহু নজির পাওয়া যায়।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মদিনা ছিল মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনস্থল। মদিনা সনদের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একটি রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় আনা হয়। নবীজির জীবনে অমুসলিমদের প্রতি সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। অসুস্থ অমুসলিমকে দেখতে যাওয়া কিংবা তাদের ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ছিল তাঁর চরিত্রের অংশ।
সাহাবিদের যুগেও এই ধারা বজায় ছিল। অমুসলিম নাগরিকদের সামাজিক অনুষ্ঠান ও শোকানুষ্ঠানে মুসলিমদের অংশগ্রহণ পারস্পরিক সৌহার্দ্যকে আরও দৃঢ় করেছে। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চায়ও মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সহযোগিতা ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে উভয় সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে অধ্যয়ন করত এবং জ্ঞান বিনিময় করত।
সংকটকালেও ধর্মীয় ঐক্যের বহু উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে। কোনো কোনো সময়ে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করেছেন। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা রক্ষাকে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। কোরআনের নির্দেশনায় বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় রক্ষার গুরুত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিম শাসকরা গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অনুমতি দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মুসলিম নেতারা সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা উৎসবে পারস্পরিক অংশগ্রহণ মুসলিম সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
দীর্ঘ ইতিহাসে মুসলিম সভ্যতায় যে সহিষ্ণুতা, উদারতা ও ন্যায়ের চর্চা দেখা যায়, তা মানবিক সহাবস্থানের এক শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে, যা আজও বিশ্বসমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
সিএ/এমআর


