সমাজে মানুষ স্বভাবগতভাবেই সহমর্মী ও কল্যাণপ্রত্যাশী। তবে বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়ে পড়ে সেই মানুষগুলো, যারা শক্তি, আশ্রয় ও উপার্জনের ভরসা হারিয়েছেন। বিধবা নারী ও অসহায় দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের জীবন পারিবারিক বিচ্ছেদ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক অবহেলায় নীরব সংগ্রামে ভরে ওঠে। তাদের কষ্ট অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়।
ইসলাম এই দুর্বল মানুষের দুঃখকে শুধু মানবিক আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে ঈমানের গভীরতার মানদণ্ড হিসেবে স্থাপন করেছে। কোরআন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সমাজের প্রান্তিক মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। বিধবা ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো ইসলামে কোনো গৌণ বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারিতে। সফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) থেকে মারফু’ভাবে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের ভরণ-পোষণের জন্য চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো; অথবা সে ওই ব্যক্তির মতো, যে দিনে রোজা রাখে এবং রাতে ইবাদতে দণ্ডায়মান থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০০৬)
এই হাদিসে সমাজসেবাকে ইবাদতের সর্বোচ্চ স্তরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। জিহাদ, সিয়াম ও কিয়াম ইসলামে সর্বোচ্চ মর্যাদার আমল হিসেবে বিবেচিত। অথচ বিধবা ও অসহায়দের দায়িত্ব বহনের বিষয়টিকেও একই উচ্চতায় স্থান দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষের কষ্ট লাঘব করা নিছক সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি ইবাদতেরই অংশ।
পবিত্র কোরআনেও দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে কী ব্যয় করবে? বলো, যা কিছু ব্যয় করবে, তা হবে পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য। (সুরা বাকারা: ২১৫) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিদের। (সুরা আল-ইনসান: ৮) এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, সমাজের দুর্বল শ্রেণির দায়িত্ব পালন ঈমানের দাবি।
অতীত ও বর্তমানের বহু মুসলিম চিন্তাবিদও এ বিষয়ে গভীর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইবনে হাজর আল-আসকালানি (রহ.) তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বিধবা ও মিসকিনের সেবাকে জিহাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, কারণ এতে রয়েছে অবিরাম চেষ্টা, ধৈর্য ও আত্মত্যাগ। বিশুদ্ধ নিয়তে এ কাজ করলে তা ধারাবাহিক ইবাদতে পরিণত হয়।
ইসলামের ইতিহাসেও এর বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে বিধবা ও ইয়াতিমদের খোঁজখবর নিতেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন। সাহাবিরাও এই শিক্ষাকে জীবনের অংশে পরিণত করেছিলেন। ওমর (রা.) রাতের আঁধারে অসহায় পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য বহন করতেন, যা ঈমানি দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইবাদত কেবল মসজিদকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। যে সমাজে সম্মিলিতভাবে দুর্বলদের দায়িত্ব পালন করা হয়, সেখানে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজও আমাদের চারপাশে নীরবে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে বহু বিধবা ও অসহায় পরিবার। তাদের পাশে দাঁড়ানো কোনো অতিরিক্ত দয়া নয়; বরং এটি ঈমানি দায়িত্ব। সামান্য সহযোগিতাও কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এবং সমাজে মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দিতে পারে।
সিএ/এমআর


