পৃথিবীতে বর্তমানে জনসংখ্যা আটশ কোটির বেশি। এর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সোয়া দুইশ কোটি। এই সংখ্যার মধ্যে শিয়া-সুন্নি, আহলে হাদিস-দেওবন্দি, সালাফি-মডারেটসহ নানা ঘরানা ও মতপথের মানুষ অন্তর্ভুক্ত। অনুসারীর সংখ্যার দিক থেকে ইসলাম দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হলেও বিশ্বে আজও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বিশ্বে স্বাধীন দেশের সংখ্যা প্রায় দুইশ হলেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্রের সংখ্যা নেই বললেই চলে। মাত্র পঞ্চাশটির মতো দেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এসব দেশের অনেকগুলো আবার আয়তনে ছোট এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। অন্যদিকে প্রায় ছয়শ কোটি অমুসলিম জনগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন জাতি, রাষ্ট্র ও দর্শনের হলেও ইসলাম ও মুসলমানদের প্রশ্নে তারা প্রায়শই অভিন্ন অবস্থান নেয়। হাদিসে এসেছে, গোটা কুফুরি শক্তি এক জাতির মতো।
বর্তমান বিশ্বচিত্রে ফিলিস্তিনে ইসরাইলের দখলদারিত্ব, আল-আকসা সংকট, কাশ্মীর, আরাকান ও উইঘুর অঞ্চলে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এ বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। বহিঃশত্রুর এমন চাপের মধ্যেও মুসলমানদের ভেতরেই পারস্পরিক বিভাজন, দলাদলি, ভুল ধরাধরি ও শক্তিক্ষয় চলমান রয়েছে।
লেখকের মতে, প্রকৃত প্রতিপক্ষ নির্ণয়ে ভুলের কারণেই মুসলিম সমাজ নিজেদের ভেতরেই শক্তি অপচয় করছে। ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো বিষয়ের সঠিক পরিচয় তার বিপরীত দ্বারা নির্ণীত হয়। ইসলামের বিপরীত কুফুর এবং তাওহিদের বিপরীত শিরক। সুতরাং যে কুফুর ও শিরকের অবস্থানে রয়েছে, সেই হলো মুসলমানের প্রকৃত প্রতিপক্ষ। মতভিন্নতা থাকলেও যারা মুসলমান, তারা কখনোই ইসলামের মৌলিক শত্রু নয়।
ইতিহাস থেকে উদাহরণ টেনে লেখক স্মরণ করিয়ে দেন, কুদস বিজেতা সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ বিরোধে জড়াননি। তিনি তার সব শক্তি ও শত্রুতা সঞ্চয় করেছিলেন ক্রুসেডারদের মোকাবিলার জন্য। এটাই ছিল দূরদর্শী নেতৃত্বের নমুনা।
বর্তমান যুগকে লেখক একটি যুগসন্ধিক্ষণ বলে আখ্যা দেন। এই সময়ে আবেগ নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত কর্মপন্থা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হলেও ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। তাই হঠাৎ করে সমাজকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আদর্শে রূপান্তরের চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
লেখকের মতে, ইসলামী নবজাগরণের জন্য অন্তত ৫০ বছরের ভিশন ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামী চেতনা জাগ্রত করা, মানবসেবা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং আদর্শ নেতৃত্ব গড়ে তোলাই হতে পারে এই পথচলার মূল ভিত্তি।
লেখার শেষাংশে লেখক আহ্বান জানান— ঘরানাগত সংকীর্ণতা পরিহার করে উদার মানসিকতায় এগিয়ে আসতে হবে। বিভাজনের বদলে ঐক্য, কঠোরতার বদলে সহজতা, আতঙ্কের বদলে আশার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। মানুষের ভুলকে ক্ষমার চোখে দেখে ভালোবাসা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে মন জয় করাই ইসলামের নবজাগরণের অন্যতম শর্ত বলে তিনি মত দেন।
সিএ/এসএ


