ধর্ম মানুষের জীবনে শুধু আধ্যাত্মিকতার উপকরণ নয়, বরং মনুষ্যত্বের বিকাশের প্রধান হাতিয়ার। ধর্মকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—স্বভাব ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক ধর্ম। স্বভাব ধর্ম বলতে কোনো বস্তুর প্রকৃতিগত অবস্থাকে বোঝানো হয়। যেমন বরফ পানিতে ভাসে, চুম্বক লৌহজাত বস্তুকে আকর্ষণ করে। এ ধরনের নিয়মকে স্বভাব ধর্ম বা সংস্কার ধর্ম বলা হয়।
আধ্যাত্মিক ধর্ম হলো মানুষের ভেতরে নিহিত অফুরন্ত শক্তি উদঘাটনের প্রক্রিয়া। ধর্ম মানে কেবল ইহ-পরকালে নন্দিত জীবন গঠনের মূল ভিত্তি নয়, বরং এটি মানুষের মধ্যে থাকা লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, অজ্ঞানতা ইত্যাদি ময়লা দূর করে মনের পরিশুদ্ধি ঘটায়। প্রজ্ঞা ও ধর্মবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কখনো অধর্মের পথে চলেন না। ধর্ম শুধুমাত্র বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা বিকশিত করার মাধ্যম।
ধর্মচর্চার মূল লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ। একজন ধার্মিক ব্যক্তি নিজের মধ্যে লজ্জা, বিনয়, পরশ্রীকাতরতা ত্যাগ করে, শান্তি ও সহজ সরলতার মাধ্যমে অন্যের প্রতি সমবেদনা প্রদর্শন করেন। ধর্মান্ধতা ও অতি ধার্মিকতা এ পথে বাধা। যারা ধর্মকে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে, শুধু নামধারী হয়ে থাকেন, তাদের প্রকৃত মানবিক ও ধর্মীয় গুণাবলী বিকশিত হয় না। প্রকৃত ধার্মিকতা আসে নিজের ভেতরের মূল্যবোধ ও বিবেককে শক্তিশালী করার মাধ্যমে।
মনুষ্যত্ব জন্মগত নয়, বরং অর্জিত। শিশু জন্মগতভাবে পশুর মতো কিছু আচরণ বহন করে; ধীরে ধীরে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মচর্চার মাধ্যমে সে মানুষ হয়ে ওঠে। মানুষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো বিবেক, হিতাহিত জ্ঞান ও ধর্মবোধ, যা পশুর নেই। মানুষের ধর্মচর্চা তার অন্তরের পশুত্ব কাটিয়ে তুলে ভেতরের মানবিক গুণাবলী বিকাশে সাহায্য করে।
বর্তমান বিশ্বে অশান্তি, সংঘাত, হিংসা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও অন্যায় বেড়ে গেছে। এর মূল কারণ হলো ধর্মের শিক্ষা মনের মধ্যে নেমে আসে না এবং ব্যবহারিক জীবনে প্রতিফলিত হয় না। ধর্মকে আমরা সঠিকভাবে আচরণে অনুবাদ করতে পারলে এর সুফল পেতে পারি। যেমন একজন ব্যক্তি মলম ব্যবহার না জানার কারণে আঘাত সারাতে ব্যর্থ হয়, ঠিক তেমনি ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য না বোঝা ও না অনুসরণ করায় মানব সমাজে ধ্বংস ও অশান্তি বৃদ্ধি পায়।
মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ হলো ধর্মচর্চার মূল লক্ষ্য। প্রকৃত ধর্ম পালন মানুষকে নৈতিক, প্রজ্ঞাবান, শান্তিপ্রিয় ও মানবিক করে তোলে। ধর্ম শিক্ষায় অগ্রাধিকার পাবে সেই ব্যক্তি যিনি নিজের কর্ম ও চরিত্রের মাধ্যমে মানবতার জয়গান করেন। ধর্ম কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হল জীবনের প্রতিটি দিককে মানুষিক ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।


