ইসলামি জীবনদর্শনে শাহাদাতকে ইবাদতের সর্বোচ্চ শিখর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি এমন এক গৌরবময় মৃত্যু, যা একজন মুমিনকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়। কোরআন ও সুন্নাহে শহীদের মর্যাদা, পুরস্কার ও বিশেষ সম্মানের বহু বর্ণনা এসেছে, যা এই মৃত্যুকে অন্য সব মৃত্যুর চেয়ে আলাদা করেছে।
এই মর্যাদা লাভের প্রধান শর্ত হলো ইমান এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত। পার্থিব খ্যাতি, বীরত্ব প্রদর্শন কিংবা কোনো দুনিয়াবি স্বার্থে প্রাণ দিলে তা শাহাদাত হিসেবে গণ্য হয় না। নিয়তের বিশুদ্ধতাই এখানে মূল নির্ধারক।
আরবি ভাষায় শহীদ শব্দের অর্থ উপস্থিত থাকা, সাক্ষী হওয়া বা অবগত থাকা। আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নামগুলোর একটি আশ-শহীদ, যার অর্থ এমন সত্তা, যাঁর জ্ঞান থেকে কিছুই গোপন নয়। শরিয়তের পরিভাষায় শহীদ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাফেরদের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দেন। শাব্দিক ও শরয়ি অর্থের মিল হলো, শহীদ ব্যক্তি নিজের জীবন দিয়ে সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে যান।
ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারী গ্রন্থে উল্লেখ করেন, শহীদের আত্মা সর্বদা জান্নাতে উপস্থিত থাকে, আল্লাহ ও ফেরেশতারা তাঁর জান্নাতি হওয়ার সাক্ষ্য দেন এবং মৃত্যুর সময় তিনি নিজের উচ্চ মর্যাদা প্রত্যক্ষ করেন। কিয়ামতের দিন তিনি নবীদের দাওয়াতের সত্যতার সাক্ষী হিসেবেও দাঁড়াবেন।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী শহীদ প্রধানত তিন শ্রেণির। প্রথমত, দুনিয়া ও আখেরাতের শহীদ, যিনি আল্লাহর দীনকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে রণক্ষেত্রে শহীদ হন বা সেখানে আহত হয়ে পরবর্তীতে সেই আঘাতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ক্ষেত্রে গোসল ছাড়া জানাজা ও রক্তভেজা কাপড়েই দাফনের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার শহীদ, যিনি বাহ্যিকভাবে যুদ্ধে নিহত হলেও তাঁর নিয়ত দুনিয়াবি ছিল, ফলে আখেরাতে তিনি শহীদের সওয়াব পাবেন না। তৃতীয়ত, আখেরাতের শহীদ, যাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত না হলেও পানিতে ডুবে, মহামারি, পেটের রোগ বা প্রসববেদনার মতো কষ্টকর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এবং আখেরাতে শহীদের সওয়াব লাভ করেন।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বোঝো না। অন্য আয়াতে এসেছে, তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত। মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শহীদদের এই জীবন আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, তবে তাঁদের আত্মা জান্নাতের নিয়ামত ভোগ করে। হাদিসে বর্ণিত আছে, শহীদদের রুহ সবুজ পাখির দেহে জান্নাতে বিচরণ করে এবং আরশের নিচে ঝুলন্ত প্রদীপে আশ্রয় নেয়।
হাদিসে শহীদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের কথা এসেছে। রক্তের প্রথম ফোঁটা ঝরতেই ঋণ ব্যতীত সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়, জান্নাতে তাঁর আসন দেখানো হয়, সম্মানের পোশাক পরানো হয়, হুরদের সঙ্গে বিবাহ হয়, কবরের আজাব ও কেয়ামতের দিনের মহাভীতি থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হয় এবং তাঁর মাথায় সম্মানের মুকুট পরানো হয়। তিনি তাঁর পরিবারের বহু সদস্যের জন্য শাফায়াত করার সুযোগও পাবেন।
হজরত আনাস বিন মালিকের বর্ণনায় এসেছে, জান্নাতে প্রবেশের পর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে না, একমাত্র শহীদ ছাড়া। শাহাদাতের মর্যাদা দেখে তিনি আবার দুনিয়ায় ফিরে এসে বহুবার শহীদ হতে আকাঙ্ক্ষা করবেন। শহীদদের কবরের সওয়াল-জওয়াব থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হবে, কারণ আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গই তাদের জন্য সর্বোচ্চ পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হয়।
তবে এত মর্যাদার পরও মানুষের পাওনা বা ঋণ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আল্লাহর হক মাফ হলেও মানুষের হক পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত শহীদের আত্মা ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে বলে হাদিসে এসেছে। তাই শাহাদাতের মর্যাদা লাভের পাশাপাশি দুনিয়াবি দেনা-পাওনা নিষ্পত্তির গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শহীদের দাফনের ক্ষেত্রে রাসুলের নির্দেশ হলো, তাঁদের শাহাদাতস্থলেই দাফন করা। ওহুদের যুদ্ধে শহীদ সাহাবিদের মদিনায় আনার চেষ্টা করা হলে তাঁদের রণক্ষেত্রেই দাফনের নির্দেশ দেওয়া হয়। আলেমদের মতে, এটি মোস্তাহাব আমল, যাতে শাহাদাতের স্মৃতিবিজড়িত স্থানের মর্যাদা রক্ষা পায়।
শাহাদাত লাভের বিষয়ে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। নবীজি বলেছেন, যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে শাহাদাত কামনা করে, আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদায় পৌঁছে দেন, যদিও সে নিজের বিছানায় স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ রণাঙ্গনে উপস্থিত না থাকলেও সত্যিকার নিয়ত ও আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গের মানসিক প্রস্তুতি থাকলে মহান রব তাঁর দয়ায় সেই বান্দাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন।
সারকথা, শাহাদাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু নয়, বরং সত্যের পথে অবিচল থাকা, নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং ইসলামের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকার মানসিক অবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে এই মর্যাদা লাভের প্রধান শর্ত হলো ইমান, বিশুদ্ধ নিয়ত এবং শরিয়তসম্মত পথে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করা।
সিএ/এমআর


