ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা একজন মুমিনের খাঁটি ইমানদার হওয়ার বড় প্রমাণ। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো নামাজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজরের নামাজের মর্যাদা সর্বাধিক। দিন শুরুর এই বিশেষ ইবাদতকে মহান আল্লাহ এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, পবিত্র কোরআনের একটি সুরায় তিনি সময়ের শপথ নিয়েছেন, “শপথ ফজরের।” (সুরা ফাজর, আয়াত: ১-২)
ফজরের নামাজের গুরুত্বের মূল কারণ হলো এর সময়কাল। যখন সারা বিশ্ব গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আরামদায়ক শয্যা ত্যাগ করেন। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, কষ্টের মাত্রা যেখানে বেশি, পুরস্কারও তত বেশি হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমার কষ্টের মাত্রা অনুযায়ী তোমার প্রতিদান নির্ধারিত হবে।” (ইমাম হাকেম নিশাপুরি, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, ১/৪৭২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)
ফজরের নামাজের গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ হলো:
১. দুনিয়া ও আখিরাতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ
ফজরের ফরজ নামাজের পূর্ববর্তী দুই রাকাত সুন্নত নামাজও অত্যন্ত মূল্যবান। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “ফজরের দুই রাকাত (সুন্নত) দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চেয়েও উত্তম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২৫) তিনি নিজেও এই সুন্নত কখনো বাদ দিতেন না, সাফর কিংবা বাড়ি অবস্থায়ও।
২. আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তায় থাকা
ফজরের নামাজ আদায় করলে মানুষ আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে যান। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মাদারিতে চলে গেল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৭) রাত ও দিনের ফেরেশতারা এই সময় একত্র হয়ে নামাজিদের সঙ্গে শরিক হন। ইমাম কুরতুবি ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহর জিম্মাদারিতে থাকা মানে আল্লাহর নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে থাকা।
৩. ফেরেশতাদের উপস্থিতির সময়
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ভোরের নামাজ আদায় করো; নিশ্চয়ই ভোরের নামাজ হলো উপস্থিতির সময়।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭৮) আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ফজরের নামাজের সময় রাত ও দিনের ফেরেশতারা একত্র হয়। আল্লামা নাসির আস-সা’দি উল্লেখ করেছেন, এটি কোরআনে ‘কুরআনাল ফাজর’ বা ভোরের পঠন বলা হয়েছে এবং ফেরেশতাদের উপস্থিতির কারণে এটি ‘মাশহুদা’ নামে পরিচিত।
৪. কেয়ামতের কঠিন দিনে পূর্ণ নুর
যারা অন্ধকারে মসজিদের দিকে হেঁটে যান, তাদের জন্য আল্লাহ কেয়ামতের দিন পূর্ণ নুর প্রদান করবেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “রাতের অন্ধকারে মসজিদের দিকে পায়ে হেঁটে গমনকারীদের কেয়ামতের দিন পূর্ণ নুরের সুসংবাদ দাও।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫৬১)
৫. জান্নাতের নিশ্চয়তা
ফজরের নামাজ নিয়মিত আদায় করা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “সূর্যোদয়ের আগের (ফজর) এবং সূর্যাস্তের আগের (আসর) নামাজ যে ব্যক্তি আদায় করবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৩৪) এই সময়ের নামাজকে ‘বারদাইন’ বা দুই শীতল সময়ের নামাজ বলা হয়।
৬. মোনাফেকি থেকে মুক্তির সনদ
ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা একজন মুমিনের খাঁটি ইমানের পরিচায়ক। রাসুল (সা.) বলেছেন, “মোনাফেকদের জন্য ফজর ও ইশার নামাজের চেয়ে ভারী আর কোনো নামাজ নেই। তারা যদি এর পুরস্কার জানত, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এতে শরিক হতো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৭)
৭. সারা রাত নফল নামাজের সওয়াব
ফজরের জামাতে নামাজ পড়া একরাত্রি নফল নামাজের সমতুল্য সওয়াব বয়ে আনে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাতে পড়ল, সে যেন অর্ধেক রাত নফল নামাজ পড়ল। আর যে ফজরের নামাজ জামাতে পড়ল, সে যেন সারা রাত নামাজ পড়ল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৬) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) বলেন, সারা রাত জেগে নামাজ পড়ার চেয়ে ফজরের নামাজ জামাতে পড়াই বেশি প্রিয়।
সিএ/এমআর


