কনকনে শীতের সকাল মানুষের শরীর ও মন দুটোকেই কাঁপিয়ে দেয়। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, প্রকৃতির কঠোরতা নতুন করে অনুভূত হয়। আধুনিক বিজ্ঞান এই শীতের ব্যাখ্যা দেয় সূর্যের অবস্থান, পৃথিবীর অক্ষের হেলন ও বাতাসের গতিপথের মাধ্যমে। তবে একজন মুমিনের দৃষ্টিতে শীতের বাস্তবতা শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর এক গায়েবি সত্য, যা রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর হাদিসে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, একজন মুমিনের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো— রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর প্রতিটি বাণী নিঃশর্তভাবে সত্য বলে মেনে নেওয়া। কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, নবী (সা.) নিজের ইচ্ছা থেকে কিছু বলেন না; বরং তাঁর কথা ওহিরই অংশ। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁকে সত্যবাদী ও সত্যে সমর্থিত হিসেবে আখ্যায়িত করতেন।
হাদিসে শীত ও গ্রীষ্মের ব্যাখ্যায় একটি গভীর বাস্তবতার কথা বলা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে জানায়— তার এক অংশ অন্য অংশকে গ্রাস করছে। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দেন— একটি শীতে, একটি গ্রীষ্মে। হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ যে প্রচণ্ড গরম অনুভব করে, তা জাহান্নামের উত্তাপ থেকে, আর যে তীব্র শীত অনুভব করে, তা জাহান্নামের জমহরির বা চরম ঠান্ডা থেকে।
আলেমরা ব্যাখ্যা করেন, এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর সব জায়গায় একসঙ্গে শীত বা গরম অনুভূত হবে। ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রের প্রভাব, বাতাসের প্রবাহ ও সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী কোথাও শীত বেশি, কোথাও কম হয়। এগুলো দৃশ্যমান ও প্রাকৃতিক কারণ।
তবে ইসলামে দৃশ্যমান কারণের পাশাপাশি গায়েবি কারণের অস্তিত্বও স্বীকৃত। আলেমদের মতে, সূর্যের দূরত্ব বা বাতাসের গতিপথ হলো দৃশ্যমান কারণ, আর জাহান্নামের নিঃশ্বাস হলো অন্তর্নিহিত গায়েবি কারণ। এই দুই বাস্তবতা পরস্পর বিরোধী নয়; বরং আল্লাহর কুদরতে একই সঙ্গে কার্যকর।
এ বিষয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও সবাই একমত যে, আখিরাতের বাস্তবতাকে দুনিয়ার মানদণ্ডে পুরোপুরি মাপা যায় না। কোরআনেও জমহরির শাস্তির ইঙ্গিত রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে জাহান্নামে শুধু আগুন নয়, তীব্র ঠান্ডার শাস্তিও রয়েছে।
ইমাম নববি (রহ.)সহ বহু মুহাদ্দিসের মতে, এই হাদিসকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এর বাহ্যিক অর্থই গ্রহণযোগ্য এবং তা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। আল্লাহ তাআলা এমনভাবে কার্যকারণ সৃষ্টি করেছেন, যাতে প্রাকৃতিক ও গায়েবি উভয় কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
শীতের তীব্রতা তাই শুধু শারীরিক কষ্ট নয়; এটি মুমিনের হৃদয়ে আখিরাতের ভয় ও সচেতনতা জাগানোর একটি নিদর্শন। দুনিয়ার শীত ও গ্রীষ্ম মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়— ফিরে আসার, সাবধান হওয়ার এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান।
সিএ/এসএ


