সম্প্রতি বিএনপি’র ঘোষিত “ক্লাউড-ফার্স্ট” কৌশল এবং “এআই-চালিত ডেটা সেন্টার” স্থাপনের ইশতেহার নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একাংশের দাবি, এটি নিছকই নির্বাচনী বাগাড়ম্বর- বাস্তবতার সঙ্গে যার মিল কম। তবে আপনি যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন তবে এই উদ্যোগগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি রোডম্যাপ।
“ক্লাউড-ফার্স্ট” আসলে কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, “ক্লাউড-ফার্স্ট” হলো একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত—যেখানে সরকার ও বেসরকারি খাতের নতুন তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, অ্যাপ্লিকেশন এবং ডিজিটাল সিস্টেম প্রথমেই ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামোয় নির্মাণ বা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজন অনুযায়ী সহজে সক্ষমতা বাড়ানো বা কমানো (scalability), দ্রুত সেবা প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোগত খরচ কমানো। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এই নীতি অনুসরণ করছে। এতে করে সরকারি ডিজিটাল সেবা আরও কার্যকর হয়েছে এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা বেড়েছে। সুতরাং এটি কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়; বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মডেল। আমেরিকা বহু আগেই এটা তাদের কাঠামোতে সংযোজন করেছে।
“এআই-চালিত ডেটা সেন্টার” বলতে কী বোঝায়?
খুব সহজভাবে বললে “এআই-চালিত ডেটা সেন্টার” বলতে এমন একটি আধুনিক ডেটা সেন্টার বোঝায়, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) ভিত্তিক কাজ পরিচালনার জন্য উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়। এই ধরনের ডেটা সেন্টারে সাধারণত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর ও গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU), উন্নত কুলিং সিস্টেম এবং বড় আকারের ডেটা সংরক্ষণ অবকাঠামো থাকে- যাতে বিশাল পরিমাণ তথ্য দ্রুত ও দক্ষভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। বিশ্বব্যাপী এআই গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, ফিনটেক, স্মার্ট গভর্নেন্স এবং শিল্প অটোমেশনের মতো খাতে এই ধরনের ডেটা সেন্টারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর সম্ভাবনা কতটা?
বাংলাদেশে গত এক দশকে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তার, সরকারি ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং তথ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালার গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় ডেটা সেন্টারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একাধিক ছোট ও মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার স্থাপিত হয়েছে এবং বড় পরিসরে বিনিয়োগের পরিকল্পনাও দৃশ্যমান দেখছি আমরা। এ প্রেক্ষাপটে “ক্লাউড-ফার্স্ট” নীতি ও এআই উপযোগী ডেটা সেন্টার স্থাপন বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দেশীয় সফটওয়্যার ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম উপকৃত হবে এবং আঞ্চলিক ডিজিটাল হাব হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বাড়বে।
চ্যালেঞ্জ কি নেই?
অবশ্যই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগ- এসবই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধা। তবে এগুলো অতিক্রম অযোগ্য কোন বিষয় না বাংলাদেশের জন্য। সঠিক নীতি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ কাঠামো থাকলে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।
সুতরাং বিএনপি’র “ক্লাউড-ফার্স্ট” এবং “এআই-চালিত ডেটা সেন্টার” উদ্যোগকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে খারিজ করে দেওয়া আপনার অযোগ্যতার লক্ষণ। এটি আমাদের প্রেক্ষাপটে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও সময়োপযোগী চিন্তা, যা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। দেশ গঠনের প্রশ্নে প্রযুক্তিনির্ভর ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে বিদ্রূপ না করে, বরং গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের সবার দায়িত্ব।
মুজাহিদুল ইসলাম সিয়াম, সিনিয়র জয়েন্ট সেক্রেটারি, বিএনপি – ব্রিটিশ কলম্বিয়া।
সিএ/জেএইচ


