মানুষের জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মজীবনে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে জীবনের পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয়। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানার জন্য ভালো বই, পত্রিকা ও বিভিন্ন জ্ঞানমূলক লেখা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস শুধু সন্তানদের নয়, মা-বাবাসহ পরিবারের বড়দের মধ্যেও থাকা জরুরি।
বর্তমান সমাজে অধিকাংশ পরিবারে বাবা জীবিকার প্রয়োজনে দিনের বড় একটি সময় ঘরের বাইরে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা চাকরি বা ব্যবসার পাশাপাশি গৃহস্থালির দায়িত্বও সামলান। এর ফলে শিশুরা মানসিকভাবে মায়ের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে ওঠে এবং তার আচরণ, চিন্তাভাবনা ও জীবনদর্শনের প্রভাব সন্তানের ওপর গভীরভাবে পড়ে।
শিশু-কিশোররা শুধু পাঠ্যবই থেকে নয়, বরং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে। পরিবারে বাবা-মা ও অন্যান্য সদস্যদের আচরণ, চিন্তা ও মূল্যবোধ তাদের গঠনপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হলে মা-বাবাকেও সমাজ ও বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিয়মিত সংবাদপত্র ও সমাজসচেতনমূলক লেখা পড়ার মাধ্যমে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করেন রাজনীতি সম্পর্কে জানার প্রয়োজন শুধু রাজনীতিবিদদের, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি নাগরিকেরই এসব বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা থাকা জরুরি। এতে পরিবার ও সন্তানদের বাস্তবধর্মীভাবে গড়ে তোলা সহজ হয়।
সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক পরিবারে দেখা যায়, কর্মব্যস্ততার কারণে অচেনা বা নতুন গৃহকর্মীর কাছে সন্তান রেখে অফিসে যেতে হয়। আবার কখনো নতুন শিক্ষক বা শিক্ষিকার কাছে শিশুকে একা পড়ার জন্য রেখে দেওয়া হয়। তবে নতুন কোনো মানুষের ওপর আস্থা রাখার আগে তাকে ভালোভাবে বোঝার জন্য সময় নেওয়া প্রয়োজন।
পরিবারের পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মা-বাবাকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি বা অজানা কর্মীর সঙ্গে সন্তানকে একা রেখে দেওয়া, অপরিচিত কারো সঙ্গে লিফটে ওঠা কিংবা অচেনা কারো সঙ্গে একা কথা বলা থেকে বিরত থাকতে শিশুদের সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে বাসায় নতুন কাজের মানুষ বা কেয়ারটেকারের আচরণ ও ভাষা ব্যবহারের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হলেও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। সচেতন মা-বাবা হলে তারা সন্তানদেরও এই বিষয়ে সতর্ক থাকতে শেখাতে পারবেন।
এছাড়া বই পড়ার অভ্যাস মানুষের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে কার্টুন, ভিডিও গেম ও অনলাইন বিনোদনের সহজলভ্যতার কারণে অনেক শিশু মুদ্রিত বই পড়তে আগ্রহ হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবার উচিত সন্তানদের বই পড়তে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজনে তাদের বই পড়ে শোনানো।
গবেষকদের মতে, নিয়মিত মুদ্রিত বই পড়লে মানুষের চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাই পরিবারে সবাইকে কাজের ফাঁকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়। বই কেনা সম্ভব না হলে স্থানীয় পাঠাগারের সুযোগও কাজে লাগানো যেতে পারে।
সিএ/এমআর


