পরিমল ভট্টাচার্যের লেখার ধাঁচ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেকেই ঘোরলাগা কিংবা সম্মোহনী শব্দ ব্যবহার করেন। তবে কেবল বিশেষণ দিয়ে তাঁর লেখার ব্যাপ্তি ও গভীরতা পুরোপুরি বোঝানো কঠিন। নৈসর্গিক দৃশ্য, ইতিহাস আর মানুষের জীবনের বাস্তবতা তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন, যা পাঠকের অনুভূতির গভীরে পৌঁছে যায়।
দার্জিলিংকে সাধারণত পাহাড়ি সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও সেই ঝলমলে দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে বঞ্চনা, বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের অবহেলার ইতিহাস। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, তাদের অধিকার ও চাওয়াপাওয়ার প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা লেখকের বর্ণনায় বারবার উঠে এসেছে। অফ সিজনে কুয়াশায় ঢাকা খেলনা শহরের মতো পড়ে থাকা দার্জিলিংয়ের বাস্তবতা, সেখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে লেখায়।
চাকরি সূত্রে দার্জিলিংয়ে গিয়ে লেখক নিজের শৈশবের শোনা গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাননি। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া শহরের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক অতীত আর বহিরাগত চোখে রোমান্টিক সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা বিচ্ছিন্ন জীবনের গল্প উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। দার্জিলিং স্মৃতি সমাজ ইতিহাস গ্রন্থে পাহাড়ি জনজীবনের কষ্ট, আতঙ্ক ও লড়াইয়ের বহু অনুচ্চারিত অধ্যায় একত্র হয়েছে।
লেখক দার্জিলিংয়ের মানুষের মানসিক অবস্থার পাশাপাশি জলকষ্ট, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ও স্থানীয় সংস্কৃতির কথাও তুলে ধরেছেন। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের উত্তাল সময়, সামাজিক সংকট ও রোগব্যাধির বিস্তারও তাঁর লেখায় গুরুত্ব পেয়েছে। বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি দার্জিলিংয়ের অচেনা দিকগুলো পাঠকের সামনে এনেছেন।
কুয়াশা, শীতল বাতাস আর পাহাড়ি নীরবতার ভেতর দিয়ে দার্জিলিং এক ধরনের বিষণ্ণ আবেশ তৈরি করে। লেখার প্রতিটি অনুচ্ছেদে সেই আবেশ ধীরে ধীরে পাঠকের মনেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনের সমন্বয়ে পরিমল ভট্টাচার্যের লেখায় দার্জিলিং হয়ে ওঠে শুধু একটি শহর নয়, বরং একটি জীবন্ত অনুভূতি।
সিএ/এমআর


