ধর্ম মানুষের জীবনে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ইসলামও মানুষের জন্য সহজ ও কল্যাণকর পথনির্দেশনা দিয়েছে বলে ধর্মীয় আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। আল্লাহতায়ালা মানুষকে বিচার-বিবেচনার শক্তি দান করেছেন, যার মাধ্যমে সে ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে পারে। মানুষের স্বভাবগতভাবে ভুল করার প্রবণতা থাকায় ফেরেশতাতুল্য নিষ্পাপ হওয়া সম্ভব নয়, তবে বিবেকের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষ নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে।
ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে বিবেক তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক করে। এই বিবেক মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এগিয়ে নেয় এবং মুক্তি ও শান্তিময় জীবনের দিশা দেয়। অনেকের ধারণা, শুধু নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগিতেই মুক্তি নিশ্চিত হয়, তবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে কেবল ইবাদত নয়, বরং বিবেকসম্মত আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
ইসলামে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যে নিজের প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সূরা নাজিয়াত ৪০-৪১)। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতিই মানুষের মুক্তির অন্যতম শর্ত। পার্থিব জীবনে মানুষের নানা দায়িত্ব ও প্রয়োজন থাকায় কেবল ইবাদতে সর্বক্ষণ মশগুল থাকা বাস্তবসম্মত নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তগুলোতেও ন্যায় ও সততার চর্চা জরুরি।
জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ ভালো-মন্দ, ন্যায্য-অন্যায্যের মুখোমুখি হয়। এসব ক্ষেত্রে ধর্ম মানুষকে বিবেকের ব্যবহার ও আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণের প্রতি উৎসাহ দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (আল্লাহভীরু)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব খবর রাখেন।’ (সূরা হুজুরাত: ১৩)।
ধর্মীয় বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যারা বিবেকের দংশনের ভয় রাখে তারা বড় ধরনের অন্যায় থেকে বিরত থাকে, যদিও এতে ব্যক্তিগত লাভ ত্যাগ করতে হয়। বিপরীতে, বিবেকহীন আচরণে লিপ্ত ব্যক্তিরা চুরি, ঘুষ, সহিংসতা ও অবিচারের পথে এগোয়, যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সাময়িকভাবে তারা ক্ষমতাবান বা লাভবান মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণ ও শান্তি বিবেকবানদের পক্ষেই থাকে।
ধর্মীয় শিক্ষায় বলা হয়, মানুষ যদি অন্যের শাস্তির ভয়ে নয়, বরং নিজের বিবেকের তাড়নায় সঠিক পথে চলে, তবে তাতে ব্যক্তিগত শান্তির পাশাপাশি সামগ্রিক সমাজও উপকৃত হয়। এ কারণেই ধর্ম মানবকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা উত্তম জাতি, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব।’ (সূরা আলে ইমরান: ১১০)।
ধর্মীয় আলোচনায় উপসংহারে বলা হয়, মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ, বিবেকসম্মত আচরণ ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই উত্তম জাতির মর্যাদা রক্ষা সম্ভব। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের কল্যাণে কাজ করাই ধর্মের মূল শিক্ষা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএ/এমআর


