শীত এলেই গ্রামবাংলার ভোরগুলো যেন নতুন এক মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে। কুয়াশাভেজা সকালে খেজুরগাছের মাথায় বাঁধা হাঁড়িতে টুপটাপ করে পড়তে থাকে খেজুরের রস। এই দৃশ্য দেখলেই বোঝা যায়, শীত এসেছে। বহু বছর ধরে এই রস শুধু পানীয় হিসেবেই নয়, নানা রকম ঐতিহ্যবাহী খাবারের মূল উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো খাঁটি খেজুরের রস। ভোরের তাজা রস একটু ঠান্ডা, একটু মিষ্টি, আর স্বাদে ভরপুর। অনেকেই এই রসের সঙ্গে লেবু বা আদা মিশিয়ে আলাদা স্বাদ উপভোগ করেন। শীতের সকালে এই পানীয় অনেকের কাছে শক্তি ও সতেজতার উৎস হিসেবে ধরা হয়।
খেজুরের রস দিয়ে তৈরি জনপ্রিয় একটি পদ হলো খেজুরের রসের পায়েস। এখানে চিনি বাদ দিয়ে রসের প্রাকৃতিক মিষ্টতাকেই ব্যবহার করা হয়। দুধ ও চালের সঙ্গে রস জ্বাল দিলে পায়েস হয় ঘন, সুগন্ধি এবং স্বাদে আলাদা। গ্রামাঞ্চলে অতিথি আপ্যায়নের সময় এই পায়েস বিশেষভাবে পরিবেশন করা হয়।
শীতের পিঠার মৌসুমে খেজুরের রসের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ভাপা পিঠা, চিতই বা পুলি—এই সব পিঠায় রস মেশালে স্বাদ হয় আরও গভীর ও মোলায়েম। অনেক জায়গায় আগে রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়, পরে সেই গুড় দিয়ে পিঠা বানানো হয়, যাতে স্বাদ দীর্ঘদিন থাকে।
খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় তরল গুড় ও পাটালি গুড়। এই গুড় দিয়েই শীতের অধিকাংশ মিষ্টান্ন তৈরি হয়, যেমন নকশি পিঠা, তিলের খাজা, নারকেলের নাড়ু ইত্যাদি। গ্রামবাংলার শীতকালীন খাবারের বড় অংশজুড়েই থাকে এই গুড়ের ব্যবহার।
শহুরে রুচির সঙ্গে মানিয়ে খেজুরের রস দিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের শরবত। রসের সঙ্গে লেবু, পুদিনা বা সামান্য বিট লবণ মিশিয়ে তৈরি করা এই পানীয় যেমন স্বাস্থ্যকর, তেমনি শীতের দিনের জন্য বেশ সতেজকরও বটে।
খেজুরের রস দিয়ে দই বসিয়েও তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক মিষ্টি দই। এতে আলাদা করে চিনি দিতে হয় না। এই দইয়ের স্বাদ হালকা ক্যারামেলাইজড এবং পুষ্টিগুণও বেশি বলে মনে করেন অনেকেই।
খেজুরের রস শুধু একটি খাদ্য উপাদান নয়, এটি বাংলার শীতের সংস্কৃতির অংশ। বর্তমানে এই রস দিয়ে আইসক্রিম, কেক ও নানা ধরনের ডেজার্ট তৈরির পরীক্ষাও চলছে। তবে যেভাবেই ব্যবহার হোক না কেন, খেজুরের রসের আসল আবেদন তার স্বাভাবিক স্বাদ আর গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।
সিএ/এমআর


