বাংলাদেশে শীতকাল সাধারণত পৌষ ও মাঘ মাসে দীর্ঘ হয়। প্রাচীন একটি প্রবাদ অনুযায়ী, “পৌষের শীত মোষের গায়, মাঘের শীতে বাঘ পালায়।” অর্থাৎ পৌষে মোষ কাতর হয়, বাঘ তুলনামূলকভাবে শক্ত থাকে, কিন্তু মাঘের শীতে বাঘও শীতমুখী হয়ে যায়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে জানুয়ারি মাস বাংলাদেশের সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাস হিসেবে পরিচিত।
শীতের আগমন সাধারণত পৌষের মাঝামাঝি (ডিসেম্বর–জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়। কখনো কখনো অগ্রহায়ণ (নভেম্বর–ডিসেম্বর) থেকেই শীতের ঠাণ্ডা বাতাস অনুভূত হতে পারে। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে দেশজুড়ে তীব্র শীতের কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা শহর ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে। মানুষ শীতের কাপড়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মোড়া থাকলেও মনে হতো যেন নাকে-মুখে ছোট পানির ফোঁটা পড়ছে। অনেকের কাছে এটি তুষারপাত মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ছিল ঘন কুয়াশার প্রভাব।
ইতিহাসের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা
বাংলাদেশে আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণ শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ৪৮টি স্টেশন পরিচালনা করছে। দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা একাধিকবার তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমেছে।
১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৩.৩° সেলসিয়াসে। ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা নেমে যায় ২.৮° সেলসিয়াসে। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়, যা ছিল ২.৬° সেলসিয়াস। একই বছরের সৈয়দপুরে তাপমাত্রা ছিল ২.৯° সেলসিয়াস।
উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলা যেমন নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরেও তখন তাপমাত্রা প্রায় ৩° সেলসিয়াসে অবস্থান করেছিল। উত্তরাঞ্চলই সব সময় দেশের সবচেয়ে ঠাণ্ডা এলাকা, কারণ হিমালয় ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে উত্তর ভারত থেকে প্রবাহিত শৈত্যপ্রবাহ প্রথমে উত্তরাঞ্চলে পৌঁছায়।
শীতের তীব্রতার কারণ
আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশের তীব্র শীতের পেছনে কয়েকটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ:
১. ঘন কুয়াশা – সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছতে না দেওয়ায় দিনের বেলাতেও তাপমাত্রা কম থাকে।
২. উচ্চচাপ বলয় – বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপের সৃষ্টি হলে শীতল বাতাসের প্রবাহ জোরালো হয়।
৩. ওয়েস্টার্লি ডিস্টার্বেন্স – পশ্চিম দিক থেকে আসা আবহাওয়াগত অস্থিরতা বাতাসের গতিবেগ বাড়ায় এবং কুয়াশা কমায়।
৪. রাত-দিনের তাপমাত্রার পার্থক্য – উত্তরাঞ্চলে রাতের তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়, তাই শীত আরও তীব্র লাগে।
৫. স্মগ ও দূষণ – ঘন কুয়াশা ও দূষণের মিশ্রণ চোখে ছোট পানির ফোঁটার মতো লাগে, যা প্রকৃত তুষার নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ঢাকায় এমন ঘন কুয়াশা দেখা গিয়েছিল।
শীতের পরিবর্তন ও জলবায়ু
বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, শীতের সময়কাল ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৮৯৫–২০০০ সালের আবহাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শীতের সময়কাল কমে গেছে এবং তুষারপাতও দেরিতে শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশেও ১৯৭১–১৯৮০ সালের তুলনায় ২০০৭–২০১৬ সালে শীতকালের শুরু প্রায় এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও পরিবেশদূষণ শীতের পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। কুয়াশা বেশি থাকায় দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যায়, ফলে শীত আরও বেশি অনুভূত হয়।
সিএ/এএ


