রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ কার্যত আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)—এই ছয় ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, এসব ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৬ শতাংশের বেশি অর্থ আর হিসাবে ফেরার সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত এই ছয় ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণের মধ্যেই সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো আদায় অযোগ্য বা মন্দ ঋণ, যার পরিমাণ ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত সরকারের সময়ে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ কয়েকটি বড় গ্রুপ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়। এসব ঋণের বড় অংশই আর ফেরত আসেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব গ্রুপের অনেক কর্তা কারাগারে বা দেশছাড়া। তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রায় বন্ধ। ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের কাগজপত্রেও রয়েছে নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। ফলে এসব ঋণ প্রায় পুরোপুরি আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের মন্দ ঋণ আদায়ের নজির খুবই সীমিত। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, উচ্চ ব্যয় ও সময়ক্ষেপণের কারণে একপর্যায়ে এসব ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকেই কার্যত হারিয়ে যায়। সময় যত যাচ্ছে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় না হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণের স্থিতি ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে মন্দ ঋণই ৬৯ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা—মোট ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৮৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, এর মধ্যে মন্দ ঋণ ১৮ হাজার ২১৯ কোটি বা ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণ ৭২ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে মন্দ ঋণ ২৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকা বা ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
রূপালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৪৬ হাজার ৩২১ কোটি টাকা; এর মধ্যে মন্দ ঋণ ২১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা বা ৪৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের মোট ঋণ ১২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যার মধ্যে মন্দ ঋণ ৮ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা বা ৭০ দশমিক ১২ শতাংশ। বিডিবিএলের মোট ঋণ ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা, এর মধ্যে মন্দ ঋণ ৯৫৩ কোটি টাকা বা ৪৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল তদারকির সুযোগে কিছু গ্রুপ কার্যত ব্যাংক লুটপাটে নেমেছিল। ঋণ নিয়ে ফেরত দেওয়ার কোনো উদ্যোগই তারা নেয়নি। তবু খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বার্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখনো বহাল রয়েছে। বাস্তবে খেলাপিরা আদালতের আশ্রয় নিলেও ঋণ পরিশোধে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আদায় জোরদারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষ্য, লক্ষ্যমাত্রার একটি অংশ আদায় হলেও খেলাপিরা একের পর এক অজুহাত দেখাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ঋণ তফসিল ও আদালতের মাধ্যমে আদায়ের গতি কিছুটা ফিরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা এর চেয়েও বেশি নাজুক।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, একসময় ব্যাংক খাতে রাক্ষস ভর করেছিল। তখন ব্যাংক খালি হলেও মুখ বন্ধ ছিল সংশ্লিষ্টদের। অনেক ভালো উদ্যোক্তা ঋণ পাননি, অথচ কিছু প্রভাবশালী গ্রুপ অনিয়ম করে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। এখন সেই ঋণ আদায় করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিগত সময়ে ঋণ বিতরণে নিয়ম মানা হয়নি, প্রকল্প যাচাই ও তদারকি ছিল দুর্বল। অনেক গ্রাহক জামানত ছাড়াই ভুয়া তথ্য দিয়ে ঋণ নিয়েছে। এখন সেই ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। অথচ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক হলেও কিছু ব্যাংক তা পারছে না, যা বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ইচ্ছাকৃতসহ সব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ আদায়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আদালতে আটকে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গভর্নর।
সিএ/এসএ


