২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে আছে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি নিয়ে। ভোটের দিন ৩০ ডিসেম্বর সকালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কেন্দ্রের ব্যালট বাক্স আগেই ভরে রাখা হয়েছিল, যা বিবিসির ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

নির্বাচনের দিন চট্টগ্রাম–১০ আসনের দামপাড়া সিএমপি পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ঘটনা এই অনিয়মের উদাহরণ। ভোট দিতে আসা দুজন নারী ও একজন পুরুষকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। তাদের বাধা দিচ্ছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা, যাদের গলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ছবি ও নৌকা প্রতীকসহ কার্ড ঝোলানো ছিল। একই ধরনের ঘটনা নারায়ণগঞ্জ-৫ ও কুমিল্লা-৭ কেন্দ্রে লক্ষ্য করা যায়।

বিএনপি ওই রাতের ভোটের বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি আকারে জানিয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ও প্রশাসনের সহায়তায় কমপক্ষে ১৫০টি আসনের প্রতিটি কেন্দ্রের ব্যালট বাক্সে ৪০০–৫০০ ব্যালট পেপার নৌকা মার্কায় সিল মেরে ভর্তি করা হয়েছিল।
২০১৮ সালে নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন কে এম নূরুল হুদা। রাতের ভোট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, এবং পরে ২০২৫ সালের জুনে একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৩০ ডিসেম্বর রাতেই ভোটকে প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচন দাবি করে। দলটির শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, “দেশের প্রায় সব আসনেই ভোট ডাকাতির খবর এসেছে। অবিলম্বে এই প্রহসনের নির্বাচন বাতিল হোক।” জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এই নির্বাচন জাতির সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রহসন করেছে।”

একাদশ সংসদ নির্বাচনের ১১ দিন পর ২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারি বাম গণতান্ত্রিক জোটের গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৮২ জন প্রার্থী জানান, নির্বাচনের আগের রাতেই অনেক কেন্দ্রেই ভোট দেওয়ার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ভোটাররা প্রতারিত ও অপমানিত হন, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন একযোগে কাজ করে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত করেছে।

২০১৯ সালের ৯ জুলাই কেন্দ্রভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে সুজন সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, একাদশ সংসদ নির্বাচন ‘অনিয়মের খনি’ ছিল। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রের ব্যালটে সিল মেরে ভোট ভর্তি করা হয়েছিল, রাত ১০টা থেকে শুরু করে রাত ৩টা পর্যন্ত। প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের মধ্যে ২৭ জন স্বীকার করেছেন এই রাতের ভোটের প্রক্রিয়া।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়ে স্বীকার করেছেন, পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশে ব্যালট বাক্সে রাতের ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে বলেন, “একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের ব্যর্থতার গ্লানি ছাড়া আর কিছু দিতে পারেনি। রাতের ভোটের ছবি বিবিসি প্রকাশ করেছে, যা প্রতিষ্ঠিত সত্য।”

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘রাতের ভোট’ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তখন আলোচিত হয়েছিল, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি মন্তব্য করেছিলেন, এমন ঘটনা অন্য কোনো দেশে শোনেননি।
সিএ/এমই


