বাংলাদেশের বাইরে বসবাসরত দেড় থেকে দুই কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির ভোটাধিকার কার্যকর করতে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত নিউহাম বারার গ্রিন স্ট্রিট ও স্টার্টফোর্ড এলাকায় সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালিয়েছে ‘পলিসি ফর গুড গভর্ন্যান্স’ নামের একটি সংগঠন। ২৩ নভেম্বর, ২০২৫ অনুষ্ঠিত এই কার্যক্রমে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে প্রবাসীরা ভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত হন।
ক্যাফে ও আশেপাশের এলাকা প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবন ও রাজনৈতিক আগ্রহের প্রতিফলন। ফ্লুরোসেন্ট আলোয় ঝলমল করা কাচের কাউন্টারের পেছনে রাখা খাবার ও কর্মীদের ব্যস্ততা দেখায়, কতটা সচেতন প্রবাসীরা নির্বাচনের দিকে নজর রাখছেন। কফি খাওয়ার ফাঁকে স্থানীয় প্রবাসী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ নূর আলোচনায় অংশ নেন এবং বলেন, নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই মানুষের কথাবার্তা থেমে নেই।
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর আগে নির্বাচনগুলোতে বিরোধী দলের বর্জন ও দমন–পীড়নের অভিযোগ থাকায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে যাননি। এতে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর নির্ভরশীল। শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর্তৃত্ববাদ ও দমন–পীড়নের অভিযোগও ছিল। দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আবার শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। গত ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটি প্রথম নির্বাচন, যা প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে আবেগী ও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।
যুক্তরাজ্যে ৩২ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধিত হয়েছেন। তবে ২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছেন। টাওয়ার হ্যামলেটসে প্রায় ৩৫ শতাংশ বাসিন্দা বাংলাদেশি, এছাড়া নিউহ্যাম, বার্কিং ও ড্যাজেনহ্যামে বড় সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। এই জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যই দেখায়, বাংলাদেশের ঘটনাগুলো ইস্ট লন্ডনের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না।
প্রবাসীদের ভোট প্রক্রিয়া জটিল। এনআইডি কার্ড সংগ্রহ, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, হাইকমিশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার—এই সব কারণে অনেকের আগ্রহ কমেছে। যুক্তরাজ্যের বাইরের দেশগুলোতে অংশগ্রহণ বেশি। সৌদি আরবে ২ লাখ ৩৯ হাজার, কাতারে প্রায় ৭৬ হাজার নিবন্ধিত, যেখানে যুক্তরাজ্যে মাত্র ৩২ হাজার।
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী পরিবার ও কর্মজীবনের কারণে প্রবাসীরা বাংলাদেশে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের তুলনায় স্থানীয় জীবনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তবে দেশপ্রেম ও অতীত স্মৃতি—মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, নির্বাচন অভিজ্ঞতা—তাদের ভোটে প্রভাব ফেলে।
নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা ভোটাধিকার পেয়েছেন। অধিকাংশ ব্রিটিশ বাংলাদেশি ভোটার, বিশেষ করে যারা ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করেছেন, বাংলাদেশি নাগরিকত্ব না থাকায় ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। সচেতনতা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেকেই এখনও ভোটে অনাগ্রহী। তবে যারা ভোট দিতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকের কাছে এটি স্মৃতিমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ।
সিএ/এমই


